Monday, 7 November 2022

মুল্লু (১৮ +) - ত্রিজিৎ কর Mullu pdf by Trijit Kar

একজন লেখক যে কোন বয়সেই সফল হতে পারেন তারই উজ্জ্বল প্রমাণ ত্রিজিৎ কর। তিনি কৈশোর যৌবন পার করে লেখালেখি শুরু করেও পাঠক সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছেন। হরর থ্রিলার কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা কোন কিছুই তার লেখনি থেকে বাদ পড়েনি। ইদানিংকালে তিনি ভূত প্রেস নিয়ে লেখা ও রহস্য গল্প বা উপন্যাস লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কঠোরভাবে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য লেখা মুল্লু pdf download উপন্যাসটি ডাউনলোড করুন।

 মুল্লু উপন্যাসটি সম্পূর্ণরূপে ১৮ বছরের বেশি পাঠকের জন্য লেখা। তাই কম বয়সী পাঠকরা বইটি এড়িয়ে যাবেন।
ত্রিজিৎ কর এর pdf মুল্লু download করে পড়ুন। মুল্লু pdf ত্রিজিত করের বড়দের pdf বই। ত্রিজিৎ করের বই ডাউনলোড করে পড়ুন। মুল্লু পিডিএফ পড়ে উপভোগ করুন বড়দের বই পড়ার মজা।


Labels:

Sunday, 6 November 2022

শাস্তি - সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় Shasti by Sangeeta Bandyopadhyaa

গোলপোর্কের পুরনো বইয়ের দোকোনগুলোর একটার সামনে দাঁড়িয়ে মিতুল প্রায় চিৎকোর করে উঠল। “মা, মোা, দেখো কী ভাল কনডিশন। আর সন্দুর করে বাঁধানো। মা প্লিজ কিনে দাও!” চমন দেখল মিতুল আনন্দে লোফাচ্ছে। আর তুতুল তত ক্ষণে দিদির অনুসারী হয়ে ছো মেরে তুলে নিয়েছে অমর চিত্র কথা-র বাধানো সেটটা। একটা ছোট তক্তপোশের ওপর  সাজানো অনেক বইয়ের মাঝখানে পাতা-খোলা বইটা ছিল। মিতুলের ঠিক নজর পড়েছে ওটার ওপর। দোকানদারও টুল থেকে উঠে এগিয়ে এসেছে হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে, “একশোটা বোঁধানো। আর টপ-টপ সব গল্পগুলোই রয়েছে, দেখুন।” দোকানদার চমনকে দেখছে না, তার বৌ মিত্রার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, “হাতে চোঁদ পোওয়োর মতো ব্যাপার দিদিভোই। সাড়ে সাতশো চাইছি। যদি নেন পাঁচশোতে ছেড়ে দেব। একশোটা বই একসঙ্গে কোথায় পাবেন? আর কনডিশনটা তো দেখোর মতো। একদম ব্র্যান্ড নিউ।’’ 
‘দেব’-টা দোকানদার উচ্চারে করল, ‘দোবো’। ‘দোবো’! উত্তর কলকাতার লোক গোলপোর্কে ব্যবসা করছে! হতেই পারে। 

চমন না-চেয়েও লোকটার মুখটা দেখতে গেল। বোধ হয় চিনতে পারল লোকটাকে। এবং তখনই সে ভোবল, তাকে আর কেউ চিনতে পারে নো।
মিতুল তুতুলের হাত থেকে সেটটা নিল এবার। উল্টেপাল্টে দেখছে। আবার তুতুল নিল। এবার মিত্রা হাতে তুলে নিল সেটটাকে। নীল আর  কালো রেক্সিনে মোড়া ঝকঝকে দেখতে একশোটা অমর চিত্র কথা-র সেট। মিত্রার হাত ছেকে যাদেখছে চমন। প্রথম গল্প হল ‘মোলবিকো’। ইংরেজি ভারশন। চমনের মেয়েরা ইংরেজিটাই ভোল শিখেছে। বাংলো জানে, পড়ে, সব দিক। কিন্তু ইচ্ছে করে বাংলো বই হাতে তুলে নেয়, এমনটা চমন দেখেনি। ওর ইংরেজিতেই স্বচ্ছন্দ। তবে
একটা দিক, চমনের মেয়েদের চমন এমন কোনও আহ্লাদ দিয়ে মানুষ করেনি যে, ইংরেজিতে সড়গড় বললে মনে হবে চমনের মেয়েরো ছোট ছোট পাশ্চাত্য পোশোক পরে, ফটর ফটর করে ইংলিশ বলে, কথায় কথায় ইংলিশে সোয়্যার করে, পিৎজ়া-বার্গার খায়, বা তাদের পাশ্চাত্য দেশের ছেলেমেয়েদের মতো অ্যাটিটিউড আছে, বাবা-মার মুখে মুখে উত্তর দেয়, কাঁধ ঝাঁকায় ইত্যাদি! না, এ সব কিছুই তার মেয়েরা করে। চমন ভীষণ স্ট্রিক্ট বাবা। বৌ মিত্রাও তাকে ভয় পায়। ফলে মিত্রাও মেয়েদের ব্যাপারে তার নির্দেশ অমান্য করার সাহস দেখায় না। কোথা থেকে শুরু করে চমন এখন কোথায় উঠেছে, সেটা ভেবে দেখার মতাে বিষয়! ঢাকুরিয়ার একটু ভেতর দিকে ফ্ল্যাট কিনেছে। গাড়ি কিনেছে। ভাল টাকাপয়সা জমিয়ে ফেলেছে। তেইশ বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিল। এখন সে কাঁটায় কাঁটায় পঞ্চাশ। ইন ফ্যাক্ট, আজই তার জন্মদিন। এবং এই সময়ের মধ্যে এতটা সফল হওয়ার কথা সে কদাচ ভাবেনি। অথচ পা মাটিতে রেখে চলে চমন। আর পরিবারকে সেই ভাবেই চালায়। ফলে তার মেয়েরা ট্যাঁশ হয়নি। বৌও বৌয়ের মতাে। রয়েছে। একটু দাবিয়ে রেখেছে সে ওদের, বলা যায়। জিনস-টপ পরতে দেয়নি মিত্রাকে। মেয়েরা পরে। তবে ওই, ঠিকঠাক রুচিসম্মত ভাবে। মিতুল এখন চোদ্দো। তুতুল বারাে। হয়তাে তার শাসনের ঠেলাতেই দু’জনেই একটু সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। যৎসামান্য জড়ােসড়াে হয়তাে-বা অনেকটা চল্লিশ বছর আগে তার দেখা কিশােরীদের মতাে। মেয়েদের কোলকুঁজো ভাবটা সে দেখেও দেখে না।
 এ রকমই সে চায়। তার বৌ, মেয়েরা একটু মুষড়ে থাকে, এটা তার কাছে বলতে গেলে। প্রশান্তিময়। এই কন্ট্রোলটা চলে গেলে, হঠাৎ করে এরা সব উত্তেজিত হয়ে হট্টগােল করলে, প্রগৰ্ভতা দেখালে, চনমন করে উঠলে, এমনকি খুব আনন্দিত, তৃপ্ত, উৎফুল্ল হয়ে উঠলেও তার। মাথাটা ঘেঁটে যায়, সে রেগে যায়, সে কনফিউজড হয়ে যায়। তখনই সে চেঁচামেচি করে, ধমকায়, শাসন করে সবাইকে, জোরে জোরে দরজা বন্ধ করে, এক-আধ বার বাসনকোসন... চড় থাপ্পড়! মিত্রাকেও!
 বিয়ের জাস্ট ছ'মাস পর এক বার। মিত্রার বাপের বাড়ি থেকে লােকজন এসেছিল। রবিবার দিন। দুপুর থেকে খালি কথা, খালি গালগল্প, গান, পাগলামি, চব্যচোষ্য খ্যটিন। আনন্দের হাই টাইড যাকে বলে। অসহ্য, অসহ্য লাগছিল চমনের। এক বার সে নিজেদের শােওয়ার ঘরে গিয়ে রাগের চোটে দরজার পর্দা টান মেরে পেলমেট-সহ খসিয়ে ফেলল। ভাগ্যিস ধরে নিয়েছিল, নইলে শব্দ-টব্দ হত, সেই নিয়ে আবার নাটক। সে চেষ্টা করেছিল রাগ কন্ট্রোল করতে। রাত বারােটায় মিত্রার দিদি, দিদির বর, বােন, দাদা, দাদার বৌ, বাচ্চারা বেরােল বাড়ি থেকে। মিত্রা তখনও। মশগুল হয়ে আছে। গুনগুন করে গান করছে।
“জানাে তাে, দাদার ভীষণ বন্ধু হল গায়ক অরবিন্। খুব নাম করেছে বম্বেতে। দাদাকে নাকি জিজ্ঞেস করেছে আমার বিয়ে কেমন হল, সবাই বলে ওর নাকি আমার প্রতি একটা ক্রাশ...” মিত্রার মুখটা তখন এত চকচক করছিল! মেরুন বড় গােল স্টিকার টিপ, কানে ঝুমকো, হলুদ জরির শাড়ি সারা দিন ধরে শরীরে ধামসেছে, মিত্রার অঢেল চুলের চার পাক খোঁপা আধখুলে ঘাড়ের ওপর লটকাচ্ছে। মিত্রা নতুন কেনা ফ্রিজে পায়েস ঢুকিয়ে রাখছিল, তখনই ঘুরিয়ে চড়টা। মারল চমন মিত্রার গালে।
পায়েসের বাটিতে মুখটা ঢুকে গেছিল মিত্রার, নাকি পায়েসের বাটিটা মুখে ছিটকে এসেছিল— ক্রোধান্ধ চমন সেটা চোখে দেখতে পায়নি। আজ এত বছর পর সে সব মনেও নেই। মিত্রা দিন দশেক পর সেক্স করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে জানতে চেয়েছিল, “কী কারণে? কেন?” চমন মিত্রার বুকে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে সম্পূর্ণ। আবেগবর্জিত গলায় বলেছিল, “এত হাহাহিহি ভাল লাগে না। এত গলে গলে আনন্দ করা দেখতে পারি না।”
মিত্রা শক্ত হয়ে গেছিল, “আনন্দ? অরবি না? আনন্দ?”
“হ্যাঁ। এত ফাজলামি, এত কাছা খুলে হইহুল্লোড় পছন্দ করি না।” মিত্রার কোমর কামড়াচ্ছিল চমন। সেই যে সিঁটিয়ে গেল মিত্রা, তার পর আর কোনও দিন তার সামনে হাসি, তামাশা, রঙ্গরসিকতা করেনি। টিভিও বন্ধ করে দেয় সে বাড়িতে থাকলে। স্বাভাবিক ভাবেই সে ভেবেছিল, নর্মাল থাকুক সকলে। মানে মেয়ে, বৌ। নর্মাল। যেমন সে বােঝে নর্মাল মানে।
 মেয়েদের অবশ্য আলাদা করে কিছু বলতে হয়নি। বাড়ির পরিবেশটাই তাদের তৈরি করেছে। প্রাণহীন। অনর্গল কথা নয়। হাসাহাসি রেয়ারলি। একমাত্র যদি চমন নিজে হাসে তবেই। যেমন আজ সে একটু আলগা দিয়েছে। আজ তার জন্মদিন। একটা নাগাদ গাড়ি চালিয়ে ওদের নিয়ে পূর্ণদাস রােডের একটা রেস্তরাঁয় সে খেতে গেছিল। চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, প্রন সুইট অ্যান্ড সাওয়ার।
চমন এখন কেটেকুটে হাতে পায় দুই। লােন-টোন তার কিছু নেই। মাঝে মাঝে তাকে অফিস ট্যুরে যেতে হয়। গেলে পাঁচতারায় থাকে। সকালের ব্রেকফাস্টে যত স্প্রেড থাকুক, সে দুটো ইডলি খায়। ক’টা বাদাম খায়। এক গ্লাস ফলের রস খায়। হয়তাে একটু কেক খেল। ব্যস। লাক্সারি জিনিসটাকে সে কাছ থেকে দেখেছে। দিল্লিতে তার বসদের জীবনযাপন দেখেছে। কিন্তু গত সাতাশ বছর ধরে নিজের পয়সায় চাইনিজ খেতে এলে সে চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, প্রন সুইট অ্যান্ড সাওয়ারের বেশি অর্ডার করেনি কখনও। সে কখনও মিত্রা, মিতুল, তুতুলকে জিজ্ঞেস করেনি, “কী খেতে চাও?” কখনও বলেনি, “নাও, কী অর্ডার করবে করাে।” সে ভেবেছে তার পরিবারের জন্য চারটে বিরিয়ানি, একটা মাটন চাঁপ, একটা শসা বাদে পেঁয়াজলঙ্কার স্যালাড, চারটে কোল্ড ড্রিঙ্ক, তিনটে ফিরনিই যথেষ্ট। সে শরীরটা সােফায় এলিয়ে দিয়ে মিত্রাকে বলেনি, “তুমি তন্দুরি চিকেন নাও। এত ভালবাসাে।” মিতুল হয়তাে বলেছে, “ককোরি কাবাবটা দারুণ খেতে।”
সে বলেছে, “কোথায় খেলি?” “সিমলির জন্মদিনে।”
সে বলেনি, তা হলে ককোরি কাবাব অর্ডার কর!”
 এবং সে পয়সা দিয়ে কেনা খাবার কখনও হুল্লোড় করে খেতে দেয়নি ওদের। উস, হাস! কী দারুণ! কী ঝাল! আহ, মুখে গলে গেল! যা ভাল লাগছে না! তােমারটা থেকে আমাকে একটু দাও! একটু টেস্ট করে দ্যাখাে, স্বর্গীয়! আর-একটা অর্ডার করাে! আর-একটা! না, , আমার আর-একটা কোকা কোলাই চাই, চিলড!— তারা চুপচাপ খেয়েছে সবাই। আজও চুপচাপ খেয়েছে। চাউমিন আর ওই সব। সেই যে শুভাশিসদা কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে হাতিবাগানের একটা রেস্তরাঁয় নিয়ে গিয়ে তাকে খাইয়েছিল। খেতে খেতে তার মনে হয়েছিল সে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ভাললাগার এক-একটা অনুভূতির সঙ্গে স্থির হয়ে খেয়ে চলার যুদ্ধ। হচ্ছে। সে ভাল খাবারের সঙ্গে ঘিরে ধরা সেই অনুভূতির যুদ্ধে মাতালের মতাে হয়ে গেছিল। আসলে তার মনে হয়েছিল অনেক খায়। আরও অনেক খায়। কত বছর আগের কথা। সব মনে আছে। স্বাদকোরক মনে রেখেছে, ভাল খাবার সে সেই প্রথম খেয়েছিল। মাকে এসে বলেছিল সব। মা অবাক হয়ে শুনেছিল। তার পর আশীর্বাদ করেছিল এই বলে, “যেন রােজ এমন খেতে পাস।”
আজ একটু ঢিলেঢালা ছিল তার মেজাজ। সেটা থাকলে ওরা বুঝতে পারে। ওরা ওটা লুফে নেয়। একটা মানুষের মন, মেজাজ তার পেশি থেকে প্রতিফলিত হয়। মুখের পেশি। শরীরের পেশি। ওরা বুঝে নিলেই এ রকম কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলে। যেটা এখন ঘটছে। রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যেতে যেতে সামনে পড়ে গেছে বইয়ের দোকানগুলাে। মিতুল, তুতুল, মিত্রার গালগুলাে দেখছিল চমন। তার দুম করে রাগ হয়ে গেল।
 মিত্রা এক বার তার দিকে তাকাল, তার পর বলল, “তােদের তাে এগুলাের মধ্যে বেশ ক’টা আছে।”
“কোথায়? পাঁচ সাতটা হবে!” বলল তুতুল।
মিতুল বলল, “আমি দেখেছি। ঠিক আটটা আমাদের আছে। বাকি সব নতুন। মা, এত ভাল কনডিশন আর পাব না মা।”
“নিবি?” বলল মিত্রা।
“নিয়ে নিন বৌদি। এত সস্তা। পাঁচ টাকাও পড়ছে না পার বই।”
তুতুল, মিতুল, মিত্রা, দোকানদার– পরস্পর কথা বলছে। আজ মনে হচ্ছে হঠাৎই ওরা তাকে ভুলে গেছে। সে কিছুক্ষণ চেষ্টা করল চুপ করে দেখে যাওয়ার। তার মধ্যেই দেখল মিত্রা ব্যাগ। খুলছে। নতুন ব্যাগ। চমনই কিনে দিয়েছে ক’দিন আগে। কোনও কিছুর অভাব সে রাখেনি ওদের। চমন আর পারল না, বলে উঠল, “তােমাদের লজ্জা করছে না? পাঁচশাে টাকা বার করছ ব্যাগ খুলে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছ?”
মিত্রা সঙ্গে সঙ্গে সাদা হয়ে গেল। মিতুল আর তুতুলের লাল হয়ে গেল গাল।
“না, মানে, ওরা গ্রাফিক নভেল...”
“সব চাই না তােমাদের? সব চাই? এই তাে রেস্তরাঁয় খেলে। খাবার হজমও হয়নি। এখনই?”
 “প্লিজ বাবা, বাড়ি গিয়ে বােলাে,” মিতুল কঁকিয়ে উঠে বলল।
তুতুল পিছিয়ে গেল কয়েক পা। মিত্রা বলল, “না মানে, আসলে...”
“হ্যাঁ! আসলে মানে? কী আসলে? খালি পয়সা ওড়াবে। এটা ওটা সেটা। একটা হলেই আর-একটা।”
“একটা শখ করে...।”
 “তােমাদের শখ মেটাতেই তাে আমি আছি। আমি কী করছিটা কী? তােমাদের প্রতিপালন করছি, তােমাদের আগলাচ্ছি, তােমাদের শখ মেটাচ্ছি।”
 “সামান্য একটা কারণে তুমি এত কথা বলছ? চলাে, বাড়ি ফিরি। অনেক হয়েছে আনন্দ,” মিত্রার চোখে জল, “নাহ। আর পারছি না। আর সম্ভব নয় এই অপমান সহ্য করা।”
হঠাৎই দোকানদার লােকটা তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল, “তুই খালপাড়ের চমন না? অতনু বিশ্বাস তাের কাকা ছিলেন না? নকশাল অতনু বিশ্বাস? তাের বাবার নামটা... মনে পড়ছে না। আমাকে চিনতে পারছিস? মাধব চাকী। আমাকে চিনতে পারছিস না চমন? আমার দিদির কাছে পড়তে আসতিস, মনে নেই? বিনা পয়সার টিচার ছিল আমার দিদি তল্লাটের গরিব ছেলেপিলের।
বকুলদি, মনে পড়ছে?”
থতমত ভাবটা কাটিয়ে চমন বলল, “হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। ভাল আছ?”
“আমার ক্যাসেটের দোকান ছিল একটা।”
 “হ্যাঁ। ফুটপাথের ক্যাসেটের দোকান।”
“মনে রেখেছিস। সবই তাে ভাল এখন। সে দিন আর কারওই নেই যা দেখি শুনি। পুরনাে কত জনের সঙ্গে দেখা হয়! কে বলবে এক দিন তারা অনেকেই রাতে মুড়ি চিবিয়ে শুয়ে পড়ত!”
 “হ্যাঁ। আমার অবশ্য দেখা হয় না কারও সঙ্গে।”
 চমন বলতে চাইল, ‘আমার তাে আর রাস্তার ওপর বসে খদ্দের সামলাতে হয় না! তাই সবার সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু বলল না। সে অহঙ্কারকে মনের চৌকাঠ পার হতে দেয় না।
 মাধব বলল, “তুই ভেবেছিলি তােকে চিনতে পারব না। তাই না চমন?”
 “সত্যি, কী করে চিনলে?”
সে দেখল মিত্রা আর মেয়েরা ফুটপাথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আর-একটু এগিয়ে গেলে তারা গলার আওয়াজ ওরা শুনতে পাবে না। চমন নিশ্চিন্ত হল। এ বার সে দরকার হলে মন খুলে কথা বলতে পারবে মাধবের সঙ্গে। মাধব একটা সিগারেট ধরাল। টান দিল ভুসভুসিয়ে, “তাের মা যখন হসপিটালে পড়ে ছিল সেই ছ'মাস, আমি গেছি তাে দেখতে। বকুলও গেছিল এক বার। তুই টিনের টুলে বসে থাকতিস চমন। দিন রাত। আমাদেরও তখন খাওয়া জুটত না।”
 “হুম। বসে থাকতাম। মার কোনও চিকিৎসাই হয়নি। আমি কিছু করতে পারিনি। তখন সকালে খেতাম গােয়ালাবাড়ির বাসি রুটি। রাতে ঘোঁতনের জেঠিমা ভাত দিতেন। জল-ঢালা ভাত। মা হসপিটালে। আমার পরীক্ষা। আমি হসপিটালে বসে পড়তাম মাধবদা।”
“তখন তাের মুখে একটা কান্না মাখামাখি হয়ে থাকত। তাের মুখ থেকে ওই ছাপটা এখনও যায়নি রে চমন।”
“তাই চিনতে পারলে।”
বইটা একটা প্যাকেটে ভরে দিল মাধব, “বইটা নিয়ে যা চমন। দাম দিলে দে। না দিলে না দে। কিন্তু নিজেকে আর শাস্তি দিস না। যা, যা। দ্যাখ। কোথায় গেল বৌমারা। নর্মাল হ’ চমন। এত বছর হয়ে গেছে। এখনও নর্মাল হলি না!”
চমন অসাড় হাতে মানিব্যাগ বার করে সাড়ে সাতশাে টাকাই দিল মাধবের হাতে। তার পর সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মিত্রা, মিতুলরা যে-দিকের রাস্তায় বেঁকে গিয়ে চোখের বাইরে চলে গেছে, সে দিকে। সে ভাবছিল নর্মাল শব্দটার কথা, এত কাল সে নর্মাল বলতে বুঝেছিল মায়ের মড়া শােক। শােকের পরে সাদা পর্দা ঝুলে থাকা দুটো শূন্য চোখ। আর কিছু না।

Labels:

Saturday, 5 November 2022

তাজের স্বপ্ন - নারায়ণ সান্যাল Tajer Swapna pdf by Narayan Sanyal

তাজের স্বপ্ন pdf by নারায়ণ সান্যাল Tajer Swapna pdf by Narayan Sanyal pdf

কালাে রঙের সিডান-বডি গাড়িটা বড় রাস্তা ছেড়ে স্টেশনের প্রবেশপথে পাের্টিকোর নিচে এসে অবশেষে থামল। ভাল করে তখনও ভাের হয়নি। কুয়াশার অবগুণ্ঠনে দূরের গাছপালা সব অস্পষ্ট। রাস্তার ধারে একপায়ে-খাড়া বিজলি বাতিগুলাে রাত-চরা মাতালের ঘােলাটে চোখ মেলে চেয়ে আছে ঘন কুয়াশার দিকে। তারই আবছা-আলােয় সামনের দিকে কিছুটা পর্যন্ত নজর চলে। পুব-আকাশের একটা কোণা ক্রমশ ফর্সা হয়ে আসতে শুরু করেছে। রাত-আঁচলের আড়ালে যা-কিছু সঙ্গোপন ছিল, ক্রমে ক্রমে রূপে-রেখায় তা ফুটে উঠতে শুরু করেছে, এখানে-ওখানে। গাড়ির কাচে জমেছে শিশির, চিকচিক করছে স্টেশন-বাড়ির প্রতিফলিত আলােয়। মিউনিসিপ্যালিটির ঝাড়ুদারের দল নাকে ফেট্টা জড়িয়ে ধুলাের ঝড় তুলেছে রাস্তায়।
কালাে গাড়িখানায় তিনজন যাত্রী, ড্রাইভার ছাড়া। চালকের পাশে মাঝ বয়সী একজন ভদ্রলােক। সবাঙ্গ কালে ভারকোটে ঢাকা। কানের পাশে । চুলগুলােয় পাক ধরেছে। পিছনের সীটে একজন সুপারী বৃদ্ধ। চোখে মােটা ফ্রেমের চশমা। বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল চেহারা। দেখলেই বােঝা যায় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। গুরুদায়িত্ব বয়ে বেড়াবার মত ব্যক্তিত্ব আছে তার চেহারায়। একমাথা প্ল্যটিনাম-ব্লণ্ড সাদাচুল, পিছনে ফেরানাে। ঠোট দুটি চাপা, গোঁফদাড়ি কামানাে। তীক্ষ দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়েছিলেন পাশে-বসা গাড়ির তৃতীয় যাত্রীটির দিকে। স্টেশনচত্বরে গাড়ি এসে দাড়ায়। ওঁরা নামলেন। ট্রেন আসার সময় হয়েছে। শীতের সকাল। কলগুঞ্জন জেগেছে শীতকাতুরে স্টেশনের বুকে। মাথামুথ পাগড়ির ফেট্টিতে টাকা জন-দুই কুলি এগিয়ে আসে গাড়ির দিকে। ড্রাইভার পিছনের কেরিয়ারের ঢাকনাটা খুলে দেবার উপক্রম করতেই রাশভারী বৃদ্ধ ভদ্রলােক হঠাৎ সেই তৃতীয় যাত্রীটির দিকে ফিরে বলেন, এর ভতর কি আছে প্রিয়?

নারায়ণ সান্যাল এর তাজের স্বপ্ন pdf download করুন এখান থেকে। 

Labels:

একজন ভীতু মেয়ের গল্প - প্রচেত গুপ্ত Ekjon Bhito Mayer Golpa by Pracheta Gupta

আমার বিশ্বাস হচ্ছে নো। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। কিন্তু তা কি করে হবে? সবাই ভুল জেনেছে?

বাবা সকালে বাজার থেকে মুখে বাড়ি ফিরল। একটু তাড়াতাড়িই ফিরল যেন। থলি রান্নাঘরে নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "সুলতা, এদিকে একবার শোন, কথা আছে।"
মা বিরক্ত গলায় বলল, "এখন পারবো না, দুধ বসিয়েছি। পড়ে যাবে।"
বাবা আরও গম্ভীর গলায় বলল, "পড়ুক, তুমি আগে ঘুরে এসো।"
মা বলল, "এখানে বল না।"
বাবা একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে বলা যাবে না। তুমি ঘরে এসাে সুলতা।”
আমি তখন ডাইনিং রুমে বসে। দুধের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার বেশির ভাগ বন্ধুরাই সকালে চা খায়, আমি খাই না। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে এসেও স্কুলের অভ্যেস ছাড়তে পারিনি। তা ছাড়া আমি রােগভােগা বলে মা দুধ খাওয়ায়। বাবার হাবভাবে আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। এত গম্ভীর কেন? কিছু কি হয়েছে? নাকি আমি অকারণে ভয় পাচ্ছি? ভয় পাওয়াটা আমার জন্য কোনও ব্যাপার নয়। আমি একজন ভিতু মেয়ে। পাঁচজনের মতাে সাধারণ ভিতু নয়, অতিরিক্ত ভিতু। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়া কোনও মেয়ের এত ভিতু হওয়ার কথা নয়। সবাই একরকম হয় না। আমার ভিতুপনা মাঝেমধ্যে এমন পর্যায়ে যায় যে, হাসতেও ভয় পাই। ক্লাসে বসে মেয়েরা কত সব মজার কাণ্ড করে, জোকস বলে। টিচার ক্লাসে থাকলেও গলা নামিয়ে হাসাহাসি করে। টিচার ধমক দিলে আবার মুখ মুছে ‘ভালমানুষ’ হয়ে যায়। আমি হাসি না। টিচার যদি দেখে ফেলে। ছােটবেলা। থেকেই আমি এরকম। মায়ের হাত বঁটিতে কেটে গেলে ভয় পেতাম, বাবা অফিস থেকে ফিরতে দেরি করলে ভয় পেতাম, ভাইয়ের বেশি জ্বর হলে ভয় পেতাম। বড় হয়েও এই ভয় অসুখ যায়নি। কোনও গােলমালের ধারে কাছে থাকি না। একবার কলেজে দু’দল মেয়েতে মারপিট লাগল। পার্টি পলিটিক্সের ব্যাপার। আমি ভয় পেয়ে কমনরুমে ঢুকে দরজা আটকে বসেছিলাম।
শুধু কলেজে কেন, পথে ভিড় দেখলেও আমি সে মুখাে হই না। বন্ধুরা বলে, “চল গিয়ে দেখি, নিশ্চয়ই ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটেছে।”
আমি বলি, “না থাক। চল অন্য পথ ধরি।” বন্ধুরা বলে, “ওরে ভিতু মেয়ে, পথ বদলে ঝামেলা এড়াতে পারবি? ঝামেলা ঠিক তােকে ধাওয়া করবে।”
 আমি বলি, “ওসব জ্ঞানের কথা রাখ। এখন তাে সরে পড়ি।”
 ছােটবেলা থেকেই বন্ধুরা আমাকে ‘ভিতু মেয়ে’ বলে। ঠিকই করে। কম বলে, আরও বেশি বলা উচিত।
বাবা বেডরুমে ঢুকে গেল। শুনলাম, নিচু গলায় মাকে কিছু বলছে। আবছা ওদের কথা শুনতে পেলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে এল। বুঝতে পারলাম, একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। মায়ের গলায় আতঙ্ক। বলল, “সে কী! সত্যি ?” বাবা বলল, “হ্যাঁ, বাজারে শুনে এলাম।” মা বলল, “তুমি নাম ঠিক শুনেছ?”
বাবা বলল, “সেরকমই তাে মনে হল। তাই তাে বলল যেন। আমি তাে জিজ্ঞেস করতে পারি না।”
মা বলল, “কাল রাতেও তাে ওই মেয়ের সঙ্গে কলি ছিল।”
বাবা বলল, “সেই কারণেই তাে চিন্তায় পড়েছি। কলি যদি সত্যি ওই মেয়ের সঙ্গে থেকে থাকে, কী হবে ভাবতে পারছ?”
বাকি কথা শুনতে পেলাম না। একটু পরে দু’জনে বেরিয়ে এল। এখন মায়ের মুখও বাবার মতাে থমথমে। রান্নাঘর থেকে দুধের গ্লাস এনে ঠক করে আমার সামনে বসিয়ে মা বলল, “তাের সঙ্গে কথা আছে কলি।”
আমি বললাম, “এখন বলবে?”
মা বলল, “দুধটা আগে খেয়ে নে। দোতলায় আয়।”
দোতলায় দেড়খানা ঘর। আগে একটাই ছিল, ভাই আর আমি থাকতাম। এক সময়ে ভাই বলল, “দিদির সঙ্গে থাকব না।”
মা চোখ পাকিয়ে বলল, “কেন থাকবি না?”
 ভাই বলল, “বড় গার্জেনি ফলায়। আমি নিচে শােব।”
ভাই আরও বড় গার্জেনের পাল্লায় পড়ল। নিচে বাবার সঙ্গে ওর শােওয়ার ব্যবস্থা হল। তবে আমি তাে আর একা রাতে শুতে পারব না, মা ওপরে আমার কাছে চলে এল। সে ব্যবস্থারও দ্রুত বদল হল। বাবা কোনও কোনও রাতে পা টিপে ওপরে আসত। দরজায় টোকা দিত। সেদিন হয়তাে তখনও আমার ঘুম আসেনি। টের পেতাম, বাবা এসেছে। আমার যত না লজ্জা করত, বুঝতে পারতাম, আমি জেগে আছি জানলে মা বেশি লজ্জা পাবে। কেন জানি ভয়ও করত। তাই ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম। মা নিঃশব্দে খাট থেকে নেমে দরজা খুলে চাপা গলায় বাবাকে বকত।
“উফ! কী করছ? ছেলেমেয়ে রয়েছে, শুনতে পাবে।”
বাবা ফিসফিস করে বলত, “ছেলেমেয়ে ঘুমােচ্ছে। আর শুনতে পেলেই বা আমি কী করব? আমার ইচ্ছে করে না?”
 মা দরজা টেনে বেরিয়ে যেত। মনে হয়, নিচের ডাইনিং রুমে যেত। ওখানে সােফা রয়েছে। ভাইয়ের ওপর আমার রাগ হত। তবে বেশিদিন রাগ করতে হল না, কিছু দিনের মধ্যে দোতলার ঘরের পাশে ভাইয়ের জন্য ছােট মাপের ঘর হল। বাবা-মা এক ঘরে ফিরে গেল।
দুধ পুরােটা খেতে পারলাম না, মাও কিছু বলল না। দোতলার ঘরে এলে দরজা দিয়ে মা কথা শুরু করল। যেন জিজ্ঞাসাবাদ।
“কাল তুই তিথির সঙ্গে ছিলি?” আমি বললাম, “ছিলাম তাে। কলেজ শেষ হলে কোচিং গেলাম, সেখান থেকে দু’জনে গেলাম মিতালিদির বাড়িতে। তুমি তাে সব জানাে মা। বলেই গিয়েছিলাম, ফিরতে রাত হবে। মিতালিদি-আশুদার ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির নেমন্তন্ন ছিল। এর মধ্যে ভুলে গেলে?”
মা দম বন্ধ করে, চোখের পাতা না-ফেলে বলল, “তারপর?”
আমি বললাম, “তারপর আর কী? রাত হয়েছে দেখে আশুদা আমাদের অটোতে তুলে। দিয়ে গেল। ভাইকে তাে ফোন করে গলির মােড়ে আসতে বললাম, ও বলল, পারব না, ওর নাকি পড়া আছে।”
মা গলা নামিয়ে বলল, “তিথির কী হল?”
আমি ভয় পাওয়া গলায় বললাম, “কী আবার হবে? আমি আমাদের গলির মােড়েই নেমে গেলাম, তিথি ওই অটোতেই চলে গেল। ওর তাে আরও খানিকটা যেতে হয়, তারপর রিকশার পথ। তুমি তাে জানাে। কেন কী হয়েছে মা?”
 মা একটু চুপ করে থেকে বলল, “ওই মেয়ের সঙ্গে কাল রাতে তাের কথা হয়েছে? মেসেজটেসেজ কিছু?”
আমি বললাম, “না, কাল বাড়ি ফিরে দেখলাম, মােবাইলের ব্যাটারি গােলমাল করছে। ফোনটা বন্ধ করে রেখেছি। আজ দোকানে দেখাব। কী হয়েছে?” 
 মা আবার একটু চুপ করে থেকে কিছু ভাবল, বলল, “ফোন দেখাতে হবে না, তুই মােবাইলটা আমাকে দে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন?” মা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কেন তােমায় জানতে হবে না। তুমি দাও। কেউ যদি মােবাইলের কথা জানতে চায় বলবে, হারিয়ে গেছে।”
আমি আবার বললাম, “কী হয়েছে মা? বলছ না কেন? তিথির কিছু হয়েছে?”
 মা রাগে গরগর করতে-করতে বলল, “কী হবে? ভদ্রলােকের মেয়ে রাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে যা হয়, তাই হয়েছে! ছি ছি!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ঘুরে বেড়ায়নি তাে!। বাড়ি ফিরছিলাম।”
মা এবার গলা তুলল। বলল, “ওই একই হল। অসভ্য, বাঁদর মেয়ে! কে বলেছিল নেমন্তন্নে যেতে? গেলেও সন্ধের আগে ফিরে এলে না কেন?”
আমাকে বাড়িতে বকুনি খেতে হয় না। ছােটবেলাতেও হয়নি। আমি শান্ত এবং বাধ্য। মেয়ে। লেখাপড়ায় মাঝারি ধরনের হলেও পড়তে বসা নিয়েও বাবা-মাকে কখনও বলতে হয়নি। বাড়িতে না-বলে, আমি কোথাও যাই না। বন্ধুদের বাড়ি বা সিনেমা দেখতে গেলে আগে পারমিশন নিই। শুধু তাই নয়, ফেসবুক-টেসবুকেও আমি খুব সাবধানে থাকি। অচেনা কেউ বন্ধুত্ব করতে চাইলে পারতপক্ষে যাই না। যদিও আমার সঙ্গে ছেলেরা বন্ধুত্ব করতে চায় না। চাইবার কারণও নেই। আমাকে দেখতে সুন্দর নয়। গায়ের রং কালাের দিকে, চেহারাও রােগা। সুন্দরী রােগা নয়, অসুস্থ ধরনের রােগা। বুকও অন্য মেয়েদের তুলনায় ছােট। তিথিরই তাে ব্রা-এর সাইজ কত বেশি। গড়নও সুন্দর। ও আমার বুক নিয়ে চিন্তিত।
“কলি, ম্যাসাজ করা।” আমি লজ্জা পেয়ে বলি, “ধুস! কী হবে?” তিথি বলে, “তাের কিছু হবে না, তাের বরের অসুবিধে হবে। আদর শুরুতেই ফুরিয়ে যাবে।”
আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। চারপাশ তাকিয়ে বলি, “চুপ কর।”
তিথি নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আর-একটা পথ আছে। একজন বয়ফ্রেন্ড যদি ফিট করতে পারিস। নটি বয়ফ্রেন্ড। ফাঁক পেলেই হালুম হুলুম করে। থাবা বসাবে।”
 আমি তিথির পিঠে কিল মারি। তিথি যেমন মজার, তেমন ডাকাবুকো। ওকে দেখতেও ঝকমকে। সাজতেগুজতে ভালবাসে। আমার মতাে নয়। আমি বেশি সাজটাজের মধ্যে নেই।
রােগাভােগা, কালেকুলাে মেয়ে। বেশি সাজলে ভূতের মতাে লাগে। তিথি একদিন আমাকে তার ব্যাগ থেকে কন্ডােমের প্যাকেট বের করে দেখিয়েছিল। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
“একটা রাখবি নাকি?”
আমি নিচু গলায় বলি, “তিথি, তাের পায়ে পড়ি, ওটা আগে ব্যাগে ঢােকা।”
আমি মাকে মােবাইল ফোনটা দিতে মা ঘটনা বলল। আমি বিস্ফারিত চোখে সব শুনলাম। শুনতে-শুনতে বিছানার চাদর খিমচে ধরলাম।
 মা বলল, “বসাকদের বাগানে একপাশে পড়ে ছিল। মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে একজনের নজরে আসে। চেনা যাচ্ছে না। পাশে একটা রড ছিল। লােহার রড। মনে হয় ওটা দিয়ে...”
আমি কোনওরকমে বললাম, “বেঁচে আছে?” মা বলল, “জানি না। জানতে চাইও না। আমি শুধু আমার মেয়েকে নিয়ে ভাবছি। কে মরল, কে বাঁচল দেখার দরকার নেই। কাল তােদের সঙ্গে আর কেউ ছিল? ওই মেয়ের সঙ্গে? কোনও ছেলে?”
আমার গলা থেকে কথা বের হচ্ছে না। কোনওরকমে অস্ফুটে বললাম, “না।”
মা একটু চুপ করে থেকে হিসহিসিয়ে বলল, “ঠিক আছে। ঘর থেকে বেরােবি না। মােবাইল ফোন আমি বন্ধ করে আমার কাছে রেখে দিচ্ছি। তাের বাবা বলেছে।”
 আমি খাটের ওপর ধপ করে বসে পড়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলাম, “মা, কী হবে?”
 মা এগিয়ে এসে দু'হাত দিয়ে মুখটা চেপে। ধরে বলল, “চুপ, একদম চুপ। এক ফোঁটা কাঁদবি তাে মেরে পিঠ ভেঙে দেব! রাস্তায় ধিঙ্গিপনার সময় মনে ছিল না? মনে ছিল না মেয়ে হয়ে জন্মেছিস? এখনকার দিনকাল কেমন জানিস? অসভ্য! কেন? কেন রাত করেছিলি? কেউ যদি জানতে পারে কী হবে ভাবতে পারছিস? মুখ থেকে টু শব্দটি বের করবি না। আশপাশের বাড়িতে যেন ঘুণাক্ষরে বুঝতে না পারে। এমন কোনও আচরণ করবি না যাতে মনে হয়, ওই মেয়ের সঙ্গে তাের ঘনিষ্ঠতা ছিল। মনে থাকবে?”
শুধু বাবার কাছ থেকে নয়, মা খবর পেয়েছে। কমলদির কাছ থেকেও। কমলদি সকালে বাসন। মাজতে আসে। একটু বেলা হয়। আরও দুটো বাড়ি হয়ে আসে। কমলদি এসে মাকে বলল, “জানাে বৌদি, কাপড়চোপড় খােলা অবস্থায় ঝােপের ধারে পড়েছিল। প্রথমটায় চেনা যায়নি। মুখ ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। পরে ব্যাগে কাগজ পেয়েছে। কী যেন নাম বলছে সবাই...”
মা কমলদিকে থামিয়ে দিয়েছে, “থাক ওসব কথা, আমাদের নাম জেনে দরকার কী? তুমি কাজ সারাে দেখি কমলা”
কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গলা ছেড়ে কাঁদি। গলা ছেড়ে তাে দূরের কথা, বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদতেও পারছি না। আমার ভয় করছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। বিছানার চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে খাটের গায়ে হেলান দিয়ে জবুথবু মেরে বসে রয়েছি। একটু কি কাঁপছি? হ্যাঁ, কাঁপছি। কাঁপছি অথচ কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ভয় চরম হলে ঠান্ডা গরমের অনুভূতি গােলমাল করে।
বাবা যেমন বাজার করতে গিয়ে জেনেছে, ভাই খবর পেয়েছে বন্ধুদের কাছ থেকে। ওর হােয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ এসেছে। আসবেই তাে। এলাকাটা তাে বড় কিছু নয়। সবাই সবাইকে চেনে। ভাই বাবার কাছে এল। আমি ওই সময় নিচে গিয়েছিলাম। মা যদি মােবাইলটা ফেরত দেয়, একজন-দু’জনকে ফোন করে ঘটনাটা পরিষ্কার করে জানতে পারি। তার আগেই ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, “বাবা, তুমি শুনেছ?”
বাবা থম মেরে বসেছিল। ক্লাস টেনে পরা ছেলের দিকে মুখ তুলে বলল, “কী হয়েছে?”
ভাই বড় বড় শ্বাস ফেলে বলল, “বসাকদের বাগানে আজ নাকি...”
বাবা ভাইকে থামিয়ে দিয়ে চাপা ধমক দিয়ে বলল, “বিন্টু, তােমার লেখাপড়া হয়ে গেছে? কোন বাগানে কী হয়েছে এই সব আলােচনা করার সময় এখন? যাও, পড়তে যাও।”
ভাই বলল, “বাবা, শুনছি মেয়েটা নাকি দিদির কলেজে পড়ত। সত্যি? দিদিকে জিজ্ঞেস করি, চিনত কিনা।”
বাবা ঠান্ডা গলায় বলল, “না জিজ্ঞেস করবে । এটা জিজ্ঞেস করার মতাে কোনও বিষয় নয়। তােমার দিদির কলেজে এক হাজার মেয়ে পড়ে, সে তাদের সবাইকে চেনে?”
ভাই বলল, “হতেও তাে পারে বাবা।” বাবা চিৎকার করে বলে উঠল, “শাট আপ! একটা নােংরা মেয়েকে তােমার দিদি চিনবে কেন? তুমি এ বিষয়ে আর একটা কথাও বলবে না। পড়তে যাও!”
 ভাই ড্রইংরুমে গিয়ে টিভি চালাল। খবরে নিশ্চয়ই বলবে। লােকাল চ্যানেলে এসব বলে। টিভির আওয়াজে বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে হুংকার দিলেন, “টিভি কে চালিয়েছে?”
ভাই বলল, “আমি।” বাবা কথা না-বাড়িয়ে ভাইয়ের গালে ঠাসিয়ে চড় মারল। মা ছুটে আসে, আমিও গেলাম। বাবা রাগে কাঁপছে, বড় বড় শ্বাস ফেলে বলে, “খবরদার, এই বাড়িতে যেন টিভি না-চলে। খুন করে ফেলব।”
 মা আঁচলে রান্নার হাত মুছতে মুছতে বলল, “ছেলেকে মারছ কেন? তুমিই তাে দিনে দশবার করে খবর দেখাে। গাঁক গাঁক করে চলে। এখন না-চললে তাে আশপাশের বাড়ির সবাই সন্দেহ করবে।”
বাবা মুখ নামিয়ে বলল, “সন্দেহের বাকি কী আছে? বিন্টুর বন্ধুরাও যখন জেনেছে, ওই মেয়ে কলির বন্ধু হতে পারে, বাকিরাও জানবে। জানবে কী, এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনেও গিয়েছে।”
মা ভয় পাওয়া গলায় বলল, “কী হবে তা হলে?”
আমি মায়ের কাঁধ চেপে ধরলাম। মা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝিয়ে বলল, “তুই এখানে কী করছিস? যা, ওপরে যা। বাইরের কেউ এলে দেখতে পাবে। নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে বসে থাক। বুঝতে পারছিস কত বড় বিপদে আমাদের ফেলেছিস? পারছিস বুঝতে?”।
আমি ফুঁপিয়ে উঠে বললাম, “আমি কী করেছি? তিথি আমার বন্ধু।”
 মা ফোঁস করে উঠল, “এমন মেয়ে বন্ধু হয় কী করে? যে-মেয়ে অত রাতে ওখানে যায়। সেই মেয়ে তাের বন্ধু! বলতে লজ্জা করছে না? অন্ধকার গাছগাছালির মধ্যে ওর বাড়ি? অত রাতে কী করছিল? কোনও ভদ্রলােকের মেয়ে যায়? মর্নিং ওয়াক, শীতের দুপুরে পিকনিক, বিকেলে বেড়ানাে ছাড়া কেউ যায় না। বল, যায়?”
 আমি বললাম, “তােমরা তাে ওকে চিনতে। বাড়িতেও তাে কতবার এসেছে। ও ভাল।”
মা বলল, “চুপ কর। বাড়িতে এসেছে একথা আর মুখেও আনবি না।”
আমি বললাম, “হতে পারে হয়তাে শর্টকাট করবার জন্য বাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। হতে পারে না?”
 মা বলল, “না, হতে পারে না। কোনও ভদ্রসভ্য মেয়ে রাতের বেলায় একাজ করবে না।”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “হয়তাে ওকে জোর করে নিয়ে গেছে।”
 বাবা কঠিন গলায় বলল, “তােমার বন্ধুটি খুকি নয় যে, বড় রাস্তার অটো স্ট্যান্ড থেকে তাকে জোর করে অত দূরে নিয়ে যাবে। ওখানে। লােকজন থাকে। স্পষ্ট বােঝা যাচ্ছে, নিজের ইচ্ছেতে গেছে। আর সেই ইচ্ছের কথা তুমিও হয়তাে জানতে। কারণ তার কিছুক্ষণ আগেও তুমি ওর সঙ্গে ছিলে।”
আমি বললাম, “বাবা, এসব কী বলছ!” বাবা দম নিয়ে বলল, “এখন আমি বলছি, একটু পর থেকে সবাই বলবে। টিভিতে বলবে, খবরের কাগজে বলবে।”
 মা মুখে হাত চাপা দিয়ে খানিকটা সময় বসে থাকল। তারপর মুখে তুলে বলল, “আমাদের মেয়ে হয়ে তুই এমন করবি আমি কল্পনাও করতে পারছি না।”
 বাবা উত্তেজিত গলায় বলল, “কী করে কল্পনা করবে? ছেলেমেয়ের দিকে কোনও নজর রয়েছে তােমার? কার সঙ্গে ওরা মেলামেশা করছে খবর রাখাে? সারাদিন তাে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।”
মা বলল, “নিজেকে নয়, তােমাদের সংসারের হাল ঠেলতে ব্যস্ত। আর ছেলেমেয়ে তাে আমার একার নয়, তুমি কেন নজর রাখাে না?”
বাবা আরও উত্তেজিত হয়ে বলল, “কী নজর রাখব? মেয়ের পিছু নেব? কার সঙ্গে মেলামেশা করছে তার বায়ােডাটা জোগাড় করব? তার চরিত্র কেমন খোঁজ করব? রাতবিরেতে ঝােপ জঙ্গলে যায় কিনা তার হিসেব রাখব?” বাবা পায়চারি শুরু করল। বলল, “এবার পুলিশ আসবে।”
আমি বললাম, “পুলিশ আসবে কেন?” বাবা বলল, “যখন জানবে ওই বদ মেয়ের সঙ্গে তুমি রাত পর্যন্ত ছিলে, তখন তােমাকে জিজ্ঞেস করতে আসবে, কোথায় ছিলে, কেন ছিলে, কতক্ষণ ছিলে।”
আমি বললাম, “বলব, সব বলব।”
মা লাফ দিয়ে উঠে বলল, “থাবড়ে তােমার দাঁত ফেলে দেব! কাউকে কিছু বলবে না। ওপরে যাও, আমি না-বললে দরজাও খুলবে না। খাবার ওপরে দিয়ে আসব।” মুখ ফিরিয়ে মা ভাইকে। ডাকল, “বিল্ট, অ্যাই বিন্দু।” ভাই ভিতরের ঘর। থেকে এসে দাঁড়াল। মা বলল, “কেউ যদি দিদির খোঁজ করে, বলবি জ্বর হয়েছে, ওষুধ খেয়ে ঘুমােচ্ছে।”
বাবা বলল, “ওকে কিছু বলতে হবে না, কেউ এলে আমি দরজা খুলব। আসবে তাে পুলিশ।”
ভাই কাঁচুমাচু গলায় বলল, “আজ বিকেলে আমার পড়তে যাওয়া আছে।”
মা বলল, “যাবে না, বাড়ির বাইরে পা দেবে।”
আমি ওপরের ঘরে চলে এলাম। দুপুরে মা থালায় ভাত দিয়ে গেল। খেতে পারলাম না। ভাত নাড়াচাড়া করে থালা বাইরে রেখে এলাম। খাটে চাদর মুড়ি দিয়ে কুঁকড়েমুড়ে শুয়ে পড়লাম।। তিথি কেন কাল রাতে বসাকদের বাগানে গেল? সঙ্গে কি ওর কোনও বয়ফ্রেন্ড ছিল? হয়তাে মােবাইলে বলে রেখেছিল, ‘অপেক্ষা করাে, আমি আসছি।’ নাও হতে পারে। শর্টকাট করতে অটো থেকে নেমে ওই পথ ধরেছিল হয়তাে।
 কেউ জোর করে ধরে নিয়ে যায়নি তাে? অনেকে। মিলে? ওকে কতরকম ভাবে অত্যাচার করছে? ইট দিয়ে, রড দিয়ে... আমি ভাবতে চাই না। কেন চাই না? কারণ আমি একজন ভিতু মেয়ে। নিজের ভয় আর বাড়ির দোষারােপ শুনে এলােমেলাে হয়ে গিয়েছি। বিধ্বস্ত লাগছে। বাবা মা ভাইয়ের। কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি— ওদের বিপদে ফেলেছি। কেন কাল আমি নেমন্তন্নে গিয়েছিলাম?
কেন তিথি সঙ্গে ছিল? কেন? তিথি আমার বন্ধু কেন হল? সে তাে আমার মতাে নয়, আমিও তাে তার মতাে নই। সে সাহসী, ডাকাবুকো, ব্যাগে কন্ডােম রাখতে পারে। আমি ভিতু। সে সুন্দর, আমি বিচ্ছিরি। তারপরেও তার সঙ্গে কেন মিশতে গেলাম? কলেজে, পাড়ায়, কোচিং ক্লাসে কত মেয়ে রয়েছে, তারা কেউ কেউ আমারই মতাে। সাধারণ, রােগভােগা। বন্ধু হিসেবে। তাদের কাউকে বেছে নিতে পারতাম। নাকি এটাই আমার নিয়তি ছিল? ডেস্টিনি। অথবা কে জানে, ভিতু মেয়ের আবরণ ফেলে তিথির মতাে হতে চেয়েছিলাম হয়তাে। তাই ওকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।
 এলােমেলাে ভাবতে-ভাবতে এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঠিক ঘুম নয়, ঘােরের মতাে হয়তাে। সেই ঘাের ভাঙল দরজা ধাক্কার। আওয়াজে। তুমুল ধাক্কা। ভাই চিৎকার করছে—
“দিদি দরজা খােল, দরজা খােল। নিচে গিয়ে দেখ কে এসেছে। অ্যাই দিদি, মা ডাকছে তােকে। আর চিন্তা নেই দিদি, তিথিদি এসেছে। খবর ভুল ছিল, ওই মেয়ে তিথিদি নয়, অন্য একজন। দিদি, বাবা তােকে ডাকছে।”
আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আমি কি এখনও ঘােরের মধ্যে রয়েছি? ভাই কি ঘােরের মধ্যেই আমাকে ডাকছে?
আমি নিচে নেমে এলাম। হ্যাঁ, তিথিই এসেছে। ওই তাে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে গল্প। করছে। বাবা-মা খুব হাসছে। এ কি সত্যি? নাকি এখনও ঘােরের মধ্যে রয়েছি?
এখন রাত কটা? বেশি নয়, সেদিনকার মতােই হবে। আমি আর তিথি বসাকদের বাগানের পাশ দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছি। গাছগাছালির আলাে। ছায়ায় অন্ধকার পথ। তিথির সঙ্গে মেশা নিয়ে বাড়িতে আর কোনও আপত্তি নেই। কোনও কোনওদিন বলি, তিথির বাড়িতে যাচ্ছি, দু’জনে মিলে একসঙ্গে পড়ব। ফিরতে রাত হবে। পড়া হয়ে গেলে আমরা বসাক বাগানের কাছে চলে আসি৷ তিথি আমাকে নিতে চায় না। আমি জোর করে আসি। জানি, ভয়ঙ্কর বিপদে জড়িয়ে পড়তে চলেছি। তাও তিথি আমাকে নিয়তির মতাে টানে।
 আজও এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে অপেক্ষা করছি আমরা। সেই অচেনা মেয়েটা সেদিন যা পারেনি, আমরা পারব। তিথি বাড়ি থেকে বেরােবার সময় আমাকে একটা বেঁটে লােহার রড দেয়। খুব শক্ত। ঠিক মতাে মারতে পারলে একটা ঘা-ই যথেষ্ট হবে। আমি বই খাতার ব্যাগে রেখে দিই আর বাইরে থেকে চেপে ধরে হাঁটি। কেমন ঘােরের মতাে লাগে।

Labels:

Friday, 4 November 2022

রাউটার - তিলোত্তমা মজুমদার Router by Tilottama Majumdar

অবশেষে আমি আর ও বেরিয়ে পড়লাম। জানালা হাটখোলা রইল। পাখি আসেনা আর। দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনও নেই। কুকুর-বেড়াল ঢােকে না। ইলেকট্রনিক্সে ওদের কোনও আগ্রহ নেই। শেষ দানা পড়ে থাকা পর্যন্ত লােক আসত। আর আসে না। তাতে কিছু না। ও লােক চায় না। আমি চাই একটু-আধটু, যদি কথার মধ্যে আলাে ফুটতে দেখি, আমার ভাল লেগে যায়। আলাের সুঘ্রাণে বিমােহিত আমি কত বার ভুলে গেছি উনুনে চাল ফুটছে, আর সেই সব স্ফুরিত তণ্ডুল আগুনের কাছে নতজানু, নরম হতে হতে, গলে গলে, ব্যক্তিসত্তা থেকে মণ্ডসত্তায় পরিণত হয়েছে। যেহেতু আগুন নেভানাের কেউ নেই, জল। দেওয়ার বা হাঁড়ি নামিয়ে ফেলার ক্ষমতা নেই কারও, তণ্ডুলের সেই সকল গণমণ্ডসত্তা পুড়ে আংরা।
চোরও আর সাধারণ গেরস্থ বাড়িতে আসে । তারা ডাকাতের বাড়ি যায়। আর ডাকাতরা। যায় গদ্দা বানানাের কারখানায়। তাদের যে রাশি রাশি ধনরাশি। গদ্দাগুলি যখন ধনভারে মেঝে ফাটিয়ে দেয় তখন ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, কমােড সব জায়গায় কেবল আলি আর কাশেম, কাশেম আর আলি। | আমাদের শেষ দানা থেকে ভাগ নেওয়ার জন্য শেষ তিন জন এসেছিল। তখনও আমি ভাঁড়ারের খবর বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। খুব বিশ্বাস ছিল, সব ঠিক আছে। কিছু ইদুর গর্ত থেকে বেরােবেই, সাপেরা খাবে ব্যাং, ব্যাঙের জিভে আশ্চর্য আঠায় লেপটে যাবে ফড়িং ও কাচপােকা, কিন্তু আমরা ঠিক থাকব। আমি ও এ সে। আর সেই নিয়ে কত কথা, তর্ক, টেবিল চাপড়, এক জন রেগে থুতু ফেলল আর-একজনের মুখে, আমি তাকে রুমাল ধার দিলাম, সে দিব্যি রুমালের পরিবর্তে কিছু না দিয়ে সটকে পড়ল।


ও বলে, ওই জন্যই আমি তােক পছন্দ করি। । শুধু কথা আর কথা। শুধু অর্থহীন বানানাে কথা। ওহ, কী ক্লান্তিকর! কথা না বলে শুধু কাজ করলে হয় না? | আমি বিভ্রান্ত বােধ করি। এর ঘরে তার ঘরে। লােক আসে, এমনটাই দেখি। যা দেখি, তাই স্বাভাবিক বলে ভাবি। স্বাভাবিক বলেই তাে ঘটে, নাকি স্বাভাবিকতা ঘটিয়ে তােলা হয়। বিষয়টা গােলমেলে। ঘটিয়ে তুললে তাে কৃত্রিম হয়ে গেল। তখন স্বাভাবিক পাই কোথায়?
ও বলে, স্বাভাবিকের দরকার কী! কম্পিউটার আছে যখন।
আমি বলি, তা হলে কম্পিউটার হল স্বাভাবিক।
আরে, স্বাভাবিক বলে কিছু হয় না, এটাই মেনে নে। কাকে বলে স্বাভাবিক? তার। প্যারামিটার কী?
আমার এক বােন সুদূর মফসসলে প্যারাটিচার, আমার দু’বার প্যারাটাইফয়েড হয়েছে, তখন প্যারামেডিক্স আমার চিকিৎসা করেছেন, প্যারাসাইকোলজি বিষয়টা আমাকে খুব টানে কারণ তার জন্য কোনও যুক্তি লাগে না। ও প্যারামিটারের কথা তুলতেই আমি বললাম, প্যারাফুট হলে চলে না?
ওর মুখ দেখেই বুঝলাম ব্যাপক ভুলভাল। করেছি, তাই সুট করে প্যারাশুটের মতাে ভেসে। গেলাম। ও অযথা কথা বলা নিষ্ফল জ্ঞানে কাজে ফেরে। কিবাের্ডে ঝােড়াে আঙুল চালায়, আর ওর মুখ ঢুকে যায় স্ক্রিনে। অহাে, ওই দৃশ্য, ও যেন এক স্কন্ধকাটা, আমাকে ভারী উত্তেজিত করে। বুঝি না কম্পিউটার ওকে গেলে, নাকি ও গেলে যন্ত্রটাকে।
এ রকম চলতে চলতে এক দিন আমার সে। কী মাথা গরম! রাগ নয়। মাথাটা কেমন সদ্য সেদ্ধ করা গরম আলুতে ঠাসা মনে হল। কে যেন বলেছিল, বাসন মাজলে চিন্তার স্বচ্ছতা আসে, পায়ে জল ঢাললে আসে শান্ত বিনয়। তাে আমি পায়ে তিন মগ জল ঢেলে চালের চিতা জ্বালিয়েছি। যে-হাঁড়িতে, তার পােড়া দাগ তােলার জন্য স্কচ ব্রাইট ঘষছি তাে ঘষছি, আমার হাত ছড়ে গেল, ফোস্কা পড়ল, আমার ঘাড় টনটন করল, কিন্তু। দাগ উঠল না। কত কী ঘষি আমি আয়নার কাছে। দাঁড়িয়ে কলার খােসা, লেবুর খােসা, পেঁপের। শাঁস, ডাবের জল, কিন্তু ভ্রান্তিমূলক দাগ যায় না।
দাগ তুলে আপামর মসৃণ ও সফেদ হয়ে যেতে পারি না আমরা? পারি না? পারি না?
আমার পরিচারিকা বলে আজ আসব না গম দেবে, কাল আসব না চিনি, পরশু ছােলা, তরশু আলু। সাবান টুথব্রাশ খাতা আর বই। সব খাতা আসলে ইস্তাহার। সব বই আসলে অন্ধ। আর প্রতি ভােরে সাত-ঘােড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে চাল। দিয়ে যায় এক জন। খেলার শর্ত মাত্র কয়েকটা। হাত পাতাে, পাতাে হাত, মাথা নুইয়ে দাও আর চালের গান করাে। চলন রাখাে মিছিলপানে। চালিয়াত হয়ে যাও। চালিহাত জালিহাত সব হাত ভাগ্যরেখায় ভরপুর। কে করে? আমিই-ই। কে দেয়? আমিই-ই। সব ঠিক থাকবে যত দিন আমি থাকব চালিকাশক্তি।
আমি সেই সপ্তাশ্ব রথ দেখিনি। দেখলেই এক লক্ষে রথের মাথায় উঠে বসব দেখতে যে, ওখানে। প্লাস্টিকের ছাউনি আছে কি না।
 সে দিনও, ওই আকাট চিন্তাসমেত, কবে হনুমান লঙ্কা পুড়িয়ে জ্বলন্ত লেজ মুখে পুরেছিল, সেই কালি অদ্যাবধি, এমত বিচক্ষণ বিষয়সমেত আমি চলেছি অন্ধকারে। ভাবছি, ঘরে ফিরে। জানতে চাইব, কম্পিউটারের ভিতরটা কেমন, তখন, ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন তিমিরে ঘ্যাঁক করে আমাকে কামড়ে দিল একটা ট্রাক। কখন এল? শুনতেই পাইনি। এমনিতে ট্রাকেরা ভেঁপু বাজাতে খুব। ভালবাসে, কিন্তু রাত্তিরে কখনও কখনও তারা। শব্দহীন। তাই কামড় খেয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আমি পথের ধারে পড়ে রইলাম। আর ট্রাক থেকে নামতে লাগল বিশাল বিশাল বস্তা। দিব্যি হাতপাওয়ালা বস্তাগুলাে ঢুকে পড়ছে এ বাড়ি ও বাড়ি।
এই এই, ওদের মধ্যে কী আছে রে? কী আছে?
চুপ। যাই থাক, তাের কী!
একেবারে পিন্ডিকেটের মতাে কড়া ও ঘরঘরে স্বরে আমাকে বলা হল। পিন্ডিকেটের এই সদম্ভ স্বর আমি চিনি। প্রথম বার শুনেছিলাম রাস্তায়, অটো-রিকশার লাইনে, ভয়ে আমার পেচ্ছাপ পেয়ে গেছিল। দ্বিতীয় বার শুনেছি যখন আমি, স্রেফ সরলতায় বলে ফেলেছিলাম, কুত্তার মতােই, আমার দৃষ্টিতে কোনও রং নেই সাদা আর কালাে ছাড়া। পিন্ডিকেটের বিকট হাসি, এবং খোঁচা, শালা, নিরপেক্ষতার চুতিয়াবাজি? আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে বললাম, দেখার মতাে কোনও রং না-পেলে আমি কী করব?
এক প্রবল শক্তি আমার ঘাড় ধরে, দুধ চুরি করা অপরাধী বেড়ালছানার মতাে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল, আমার প্রতিবাদের ভাষা নেই, আমার।
হাঁড়িপােড় আগুন নেই, আমার রং নেই, তুলি নেই, ছুরি নেই, গাঁইতি নেই, আমি চিৎকার করে বলতে চাইছিলাম, আমি কর দিই, নিয়মিত, কখনও আইন ভঙ্গ করিনি, ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়েছিলাম, শুধে দিয়েছি সুদে-আসলে, আমি এক জন সৎ সৎ সৎ, দুম দুমাস, আমার স্বরভঙ্গ হয়ে গেছিল কখন, অবিকল ভৌ ভক মিউ মিউ ম্যাশহহ, ব্যস, আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি ভাঙা এটিএমএর সামনে। হাতে আমার এটিএম কার্ড। ভুলে গেলাম এ দিয়ে কী করব। ঝপাত করে কয়েকটা চামচিকে এসে পড়ল আমার গায়ে। কিচকিচিয়ে বলে, চাল দাও চাল দাও।
ভাগাে। অবিকল পিন্ডিকেটের মতাে গর্জে উঠলাম আমি। এ সবই কিন্তু পুরনাে কথা। ফ্ল্যাশব্যাক চলছে। তা, যে-পিন্ডিকেট আমায় বিন্দু বানিয়ে ছেড়েছে, আমি তার অনুকরণ করব না? না-করলে খাব কী! বাঁচব কী করে? যদিও বাঁচা যে কেন এত জরুরি, আমি বুঝতেই পারি না। আমার তাে মাঝে মাঝেই মরা পায়। ভয়ে মরা, লজ্জায় মরা, প্রেমে লাথ খেয়ে মরা। মরতে মরতেই বেঁচে | আছি। চামচিকে স্মরণ করিয়ে দিল, জীবন আমার
অধিকার। চাল দাও।
 চাল মারার আর জায়গা পাও না? আমি তার পিন্ডি চটকে বললাম। সে নিজের তরে চটকানাে পিন্ডি দেখে বলল, ওতে যদি চাল থাকে, তা হলে ওটাই দাও না-হয়।
কী করব ভাবছি, কারণ পিন্ডি আমি চটকাচ্ছি। কতক রাতারাতি বাতিল নােট দিয়ে। সে সব অখাদ্য। চেটে, চুষে, চিবিয়ে, ঢকঢক করে গিলে, কোনও ভাবেই খাওয়া যায় না। এবং খাওয়া বেআইনি। চামচিকেদের সে সব বােঝাব বলে আঙুল তুলে সবে সবজান্তা ভাব আনছি, গায়ে এসে পড়ল একটা বাজ।
আরে এদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই নাকি? আমার কান ঠুকরে লাল করে বলে, চাল দাও, চাল। এত ক্ষণে আমার মধ্য থেকে কৌতুক উঁকি দিল। পাকস্থলীতে বন্দি রেখেছিলাম। বেড়ালের মতাে ঝুলন্ত ছিলাম, তখন গলনালী বেয়ে উঠে এসেছে। বলে ফেললাম, তুমি এমন চালবাজ কবে থেকে হলে? সে বলে, সেই সে দিন, সেই তখনকার কথা, যখন অনেক অনেক চাল ছিল খাদ্য দফতরের গুদামে, সেই সব আলােচাল। ভালচাল বােকাচাল বােলচাল জনে জনে বিতরণ করা হচ্ছিল, আমার পিসতুতাে বােন এক সিলিন্ডার গ্যাস পুড়িয়ে আধ কিলাে চাল সেদ্ধ করে এবং তার পর থেকে দারিদ্রসীমার চাল পাল্টে যাওয়ায় বেচারা গ্যাসে ভর্তুকি পায় না আর, তখন থেকে চালই জীবন, চালই মরণ, চালই উড়ান, চালই কীর্তন।
 থামাে তাে, কথা চালাচালি ছেড়ে মূল চাল দাও দেখি হে চালবাজ। আমি বলি। আমার কণ্ঠে অপূর্ব পিন্ডিকেটি কালােয়াতি খুলেছিল তখন। বাজ বলল, ভয়ে ভয়ে বাঘে হরিণে যেমন এক ঘাটে জল খায়, আমি ও চামচিকে সব ফেলে চাল খাচ্ছিলাম। মােটা চাল, পােকা চাল, দুর্গন্ধ চাল, মুফতে যা পাওয়া যায়। তুমি কি মুফতের চাল ন, পাওনি?
আমি ক্যাবলা হয়ে বললাম, না, আমি যে সব ন, চাল দেখি সাদা। সব ট্রাক কালাে।
অকম্মার টেকি! বাজখাই উত্তর পেয়ে আমার মনে হল, এও পিন্ডিকেটের এক জন। কিন্তু সে বলল, আমি সব সময় আস্থা রেখেছি ইউনিয়নে।
 তাে? আমি ঢোঁক গিলে বললাম, আমফানে। বুঝি তার মাথার চাল উড়ে গেছে?
সে বলল, সব চাল গেছে, সব সব সব। ই আছে উ নেই, নি আছে য় নেই। শ্রমিকরা দালাল হয়ে গেছে, দালালরা ব্যাঙ্ক ডিফল্টার, ব্যাঙ্ক হয়ে গেছে পাগলা গারদ, পাগলারা গরাদের বাইরে। গিয়ে ছড়াচ্ছে বীজধান, যা থেকে কোনও এক দিন আপেল ফলবে আর বেকার সমস্যার সমাধান। হবে বলে মনে করা হয়, তবু জমির দখল নিয়ে
পাগলে পাগলে কী লড়াই, ফলে কৃষকেরা কেউ চে আদালতে, কেউ গাছের ডালে গলায় দড়ি, কেউ পর ভিখিরি। বলে চাল দাও, চাল দাও।
এই অবধি বলে বাজটা আমার টুটি কামড়ে র বলল, ইউ ইউ ইউ, মনে রেখাে, এখন আর নিয়ন
ব্রণ নিয়নতন্ত্র নেই বলে লালে লাল করে দিলাম। ল না। এখন যা আছে ছাড়াে তাে!
তা হলে কি দেশে দুর্ভিক্ষ? আমি জানতে চাওয়ায় চামচিকে বললে, যখন ভিক্ষার দরকার ছিল না, তখন সকলকে গণভিখিরি করে দিলে। সব্বাই ভিক্ষুক হয়ে হাত পেতে দাঁড়ালে ভিক্ষে দেবে কে? শুনি? এরই নাম নিয়ো-নর্মাল দুর্ভিক্ষ। তা হলে কী করে মনে হল, আমি চাল দিতে পারি? আমার ঘরের হালচালও আমি জানি না যেখানে।
কারণ, তোমাকে দেখতে চালাকের মতো হলেও তুমি গবেট। তুমি এখনও আদর শো, ভালবাসা বাসি, সৎ প্রত্যাশী, হুঁ হুঁ ট্রা লা লা লা ইত্যাদি বিশ্বাস করো। তুমি নিজেই দেখেছ কালো ট্রাক। নিজেই দেখেছ ভরা বস্তা চার পায়ে হেঁটে যায় কোন বাড়ি।
ধরো, সেই সব বস্তায় সবচেয়ে জমাট দমালো সিমেন্ট, কিংবা নরকঙ্কাল, কিংবা বাজ ও ধনেশের ঠোঁট।
চালাকি কোরো না।
আমি এ বার পালাতে লাগলাম। উফ, সে দিন কী ভাবে ওদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি সে আমিই জানি। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে গিয়েই দেখি ও দরজার কাছে তিনটে রাউটার নিয়ে খেলা করছে। আমাকে বলল, ওয়াই-ফাই কানেকশন যাতে চব্বিশ ঘণ্টা থাকে, তা দেখা কি সরকারের কর্তব্য নয়? এই নিয়ে গণআন্দোলন করতে পারি না আমরা?
ওয়াই-ফাইয়ের দাবিতে গণ, কী বললি? আন্দোলন। গণতান্ত্রিক দেশে সব কিছুই গণ, তাই না?
আমি মহাবিস্ময়ে বললাম, গনোরিয়াও? ওটা অসুখ, আর আন্দোলন হল ইয়ে, সুখের খাল কাটা।
আন্দোলন? ওরে বাবা। রাস্তায় ধর্না, পুলিশের লাঠি, গুলি, কাঁদানে গ্যাস। আর কাঁদাস না আমাকে। আমি উদ্‌ভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, ভ্রান্ত, সম্ভ্রান্ত। ধ্যাত, মাথা খারাপ হল না কি? একমাত্র মাল্টিমিলিয়নেয়ার, রাজনৈতিক নেতা আর সেলেব্রিটিরাই সম্ভ্রান্ত।
সম্ভ্রান্ত মানে কি সম্যক রূপে ভ্রান্ত? ও আমার দিকে কটমট করে তাকাল। আমি দ্রুত অন্য প্রশ্নে চলে যেতে চেয়ে বললাম, সেলেব্রিটিরা কি চাল খায়?
নিশ্চয়ই খায়। উৎকৃষ্ট চাল। যা আমাদের ঘরে আর নেই। কত দিন বলেছি রেশন কার্ড আপডেট করিয়ে নে, তা হলে মুতে চাল পেতিস।
ও সব সময় আমাকে দোষ দেয়। যেন আমি একটা আর্মাডিলো। আর সহ্য হয় না। আমি রেশন কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, স্বাস্থ্য বিমা কার্ড, পাসপোর্ট, পোস্টকার্ড, ব্র্যান্ডেড বাজারের কার্ড সমূহ এনে ওর সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম, এই নে। এর নাম জীবন। যদি এই দিয়ে চাল আনতে পারিস, আমি কান কেটে দেব।
কার?
আমি সে কথায় না-গিয়ে বললাম, খিদে পেয়েছে। ও বলল, ঘুমো। ঘুম থেকে উঠে ও বলল, খিদে পেয়েছে। বললাম, পাঁউরুটি খা।
কোনও খবর রাখিস না, দেশে পাউরুটি তৈরি হয় না কত কাল। এখন আমাদের সব বেকারি, হয় বেকার নয় বােমা বাঁধে।
কী হবে এত বােমা দিয়ে? চিনের সঙ্গে যুদ্ধ?
আরে না, চিনেরা বােমায় মরে না। ও সব অন্য কাজে লাগে।
বাব্বা, কত জানিস তুই! সারা ক্ষণ কম্পিউটারে ঢুকে থাকলে এত জ্ঞানী হওয়া যায়?
হে হে।
ও খুব খুশি হল, ওর কম্পিউটারপ্রেম স্বীকৃতি পাওয়ায়। হেসে বলল, যন্তরটা আমার সব অভাব মিটিয়েছে, সব খিদে সামলেছে, কিন্তু কিছুতেই গান্ডুটা চাল দিতে পারে না।
 অতএব আমরা বেরিয়ে পড়লাম থলে হাতে। ভিক্ষে করব, না কেড়ে নেব? ভিক্ষে,
লুঠপাট? কোনওটাই পাঠ্যপুস্তকে ছিল। আর যা পাঠ্যপুস্তকে থাকে না, তা আমি তােতাবুলবুলিময়নাকাকাতুয়া নাগরিক, আমি জানি না। তুমি যা শিখাবে তাহাই শিখিব, তুমি যা বলিবে তাহাই বলিব। আমি বলে কিছু নাই। সব
গন্ধ পাচ্ছিস? তাের নাক তাে কুকুরের মতাে, ও বলে।
আমি বলি, নাক কুকুরের মতাে নয়, ঘ্রাণশক্তি কুকুরের মতাে। গন্ধ শুকে শুকেই যাচ্ছি। তা ছাড়া...
তা ছাড়া?
আমি ওকে বললাম, কী করে আমি হেঁটে যেতে দেখেছি বস্তাদের। কী ভাবে পিন্ডিকেটের স্বর আমাকে ভয় পাইয়ে দাবিয়ে হিসি করিয়ে ঝুলিয়ে আমায় আদর শাে বাদ দিয়ে চলতে বাধ্য করতে চেয়েছে।
ও বলে, চালের বস্তার কথা আর কাউকে বলিসনি তাে?
বললাম, বলেছি, তবে ওতে সিমেন্ট থাকতে পারে, এমনটাই বলেছি।
 তুই একটা বােকা গাধা। তুই বললি আর ওরা বিশ্বাস করল!
ও আমাকে বােকা গাধা বললে আমি কিছু মনে করি না, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চারপাশে। অতিকায় ঝিঝিপােকার মতাে ডিজে বাজে। আজও বাজল। আগে তাতে থাকত শুধু বােকা বােকা বােকা বােকা, গাধা গাধা গাধা গাধা। আজ সুর ছন্দ সব বদলে গেছে। ভিখিরি ভিকিরি ভিকিরি ভিখিরি। দে দে চাল দে চাল দে চাল দে রে, দে দে চাল দে।
 ওই তাে। সােল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল ও। ওই দ্যাখ।
বিশাল চালের আড়ত। জগতের সব কিসিমের চাল এনে রেখেছে এরা। বস্তার পর বস্তার পর বস্তা। বস্তাগুলাের হাত-পা বাঁধা। আদুল-গা লােকগুলাের রকম দেখলে ভয় হয়। আমার পা ঠকঠক করে কাঁপছে। ও বলে, দেখেছিস?
হ্যাঁ। দেখেছি। দেখছি। চালের মধ্যে থাকতে থাকতে ওদের সারা গা ফুটে ঘামাচির মতো চাল বেরিয়েছে। বুকে, মুখে, হাতে, পায়ে, পিঠে। আমি বললাম, আমাকে কাজ দাও। কাজ করে দেব।
পেটচুক্তি। শ্রমের বিনিময়ে দাও চাল।
তারা হা হা করে হেসে বলল, কাজ? ফের কাজ চাইলেই গারদে পুরে দেব।
কেন? কাজ আমার সাংবিধানিক অধিকার। ও বলে, কথা বাড়াস না বোকা। চল। চাল না-নিয়ে নড়ছি না। আমার আকাট জেদ। কী অদ্ভুত বেপরোয়া জেদ রে বাবা! আমারই আমাকে ভয় লাগছে।
ওরা বলল, হ্যাঁ। কথা বাড়িয়ো না। মানে মানে কেটে পড়ো। এ দেশে লোকে হয় ভিক্ষে করবে, নয় কোটি টাকা লিটার পেট্রল আর ঊনকোটি টাকা কিলো চাল কিনবে।
তোমাদের গায়ে চাল গজাচ্ছে। এগুলো এক রকম অসুখ। আমি জানি এ অসুখ কী ভাবে সারাতে হয়, আমি চেঁচিয়ে বললাম।
হেহ, আমরা সারাতে চাই না।
আমি ঝক্কাস করে বার করলাম লুকনো ছুরি। লাফিয়ে পড়লাম এক জনের ওপরে। পিঠ থেকে চেঁছে নিলাম চাল। যত চাঁছি, তত গজায়, যত চাঁছি, তত। লোকগুলো চিৎকার করছে। চাল চাল চাল। চালের পাহাড়। দেখতে দেখতে সমস্ত চাল কালো পোকায় ঢেকে গেল। আমি ওকে ডাকতে লাগলাম, পেলি? চাল পেলি?
ও, ওই কালো ভিড়ের মধ্য থেকে বলল, চাল পেয়েছি, চাল পেয়েছি, তুই ঘরে গিয়ে চুলো জ্বালা। সব চালে তো কালো কালো কেরি পোকা। ধুস, ও ভিড়ের মধ্য থেকে মুখ তুলে বলে, ওগুলো পোকা নয়। মানুষের মাথা।
আমি সভয়ে বললাম, তুই ভিখিরি, না লুটেরা? ওরা লুটেরা, না ভিখিরি? তুই সঙ্গে ছুরি রাখিস?
রাখি না, আজ রেখেছিলাম। ওদের চেঁছে আরও চাল পেলি? পাচ্ছি আর চলে যাচ্ছে। ওগুলো লুঠ? না ভিক্ষা?
ও বলল, নিজের জিনিসও হাত পেতে নিলে ভিক্ষা, কেড়ে নিলে লুঠ। কোনওটাই দরকার হত না যদি ঘরে ঘরে সব্বাই অন্তত একটা কম্পিউটার কিনতে পেত।
ওর কথা বিশ্বাস করা উচিত? সব্বাই কম্পিউটারে মুন্ডু ঢুকিয়ে বসে আছে ভেবে আমার কেমন পাগল পাগল লাগছে।
এক জন ভূমিহীন কৃষকের কাছে, চালপট্টির নিরক্ষর শ্রমিকের কাছে, কাগজকুড়ানি মেয়েটার কাছে কম্পিউটার হয়তো পৌঁছবে শীঘ্র, কিন্তু রাউটার?
রাউটার?

Labels:

গাে-অ্যাজ ইউ-লাইক - উল্লাস মল্লিক Go as You like by Ullas Mollik

গো অ্যাজ ইউ লাইক শুরু হয়ে গিয়েছে। কল্পক স্কুল মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে। যারা সেজেছে তারা এক এক করে ঢুকছে মাঠে। মহাত্মা গাঁধী সেজেছে। একজন। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, খালি গা, মাথায় টাক, গােল ফ্রেমের চশমা, হাতে লাঠি; লাঠিতে ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা বাের্ড। লেখা, ‘আমার জীবনই আমার বাণী। জুতাে পালিশওয়ালা সেজেছে একজন। মাথায় গামছার ফেটি, কাঁধে কাঠের বাক্সে ক্রিম কালি ব্রাশ। ব্রাশের কাঠটা বাক্সে ঠকাস-ঠকাস করে ঠুকছে আর বলছে, “পালিশ! পালিশ?”

সবুজ বাঁচাও মডেল সেজেছে তিনজনের একটা টিম। ভিখারি সেজেছে একজন। ছেড়া পােশাক, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি; সুর করে বলছে, “দুটো ভিক্ষে দাও গাে বাবু; কতদিন কিছু খাইনি।”
একটা ছেলে বলল, “কী মিথ্যে কথা রে, তুই তাে একটু আগে টিফিন বাক্স থেকে স্যান্ডউইচ বের করে খাচ্ছিলি।” আশপাশের সবাই হেসে উঠল; কিন্তু ভিখারির কোন বিকার নেই; তেমনই সুর করে ভিক্ষে চেয়ে যাচ্ছে।
দু’জন লাঠিতে ঝাড়ু বেঁধে মাঠ ঝাট দিচ্ছে, সঙ্গে বালতি। বুকে লেখা, “স্বচ্ছ ভারত অভিযান।”
কল্পক সবাইকে দেখছে; খুঁজছে। একজনকে। জয়দীপ। তারও তাে সাজার কথা। তেমনই বলেছিল সে। বলেছিল, “আজ পর্যন্ত স্কুল থেকে একটাও প্রাইজ পাইনি; স্পাের্টসে হাইজাম্প, লংজাম্প, রেস-এ নাম দিয়েছিলাম ক’বার; কিচ্ছু হতে পারিনি; এবার ভাবছি গাে অ্যাজ ইউ লাইকে নামব।”
“কী সাজবি?” জিজ্ঞেস করেছিল কল্পক।।
“কী সাজা যায় বল তাে?” জয়দীপ বলেছিল, “তুই একটা আইডিয়া দে না।”
কল্পক বলেছিল, “চ্যাপলিন সাজবি? আমাদের আগের স্কুলে একটা ছেলে চ্যাপলিন সেজে একবার ফার্স্ট হয়েছিল। কালাে কোট, টুপি, বাটারফ্লাই গোঁফ হাতে ছড়ি আর হুবহু চ্যাপলিনের মতাে। হাঁটাচলা। চ্যাপলিনের কোনও সিনেমা দেখেছিস তুই?”
জয়দীপ বলেছিল, “না তাে?”
“তা হলে কঠিন। শুধু সাজলেই হবে না; চ্যাপলিনের হাঁটাচলা অঙ্গভঙ্গি সব অভিনয় করে ফুটিয়ে ‘অভিনয় আমার দ্বারা হবে না; একবার পাড়ার নাটকে নেমেছিলাম; ভুলভাল সংলাপ বলে, স্টেজে হেসে ফেলে পুরাে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।” হাসতে-হাসতে বলেছিল জয়দীপ।
কল্পক বলেছিল, “ঠিক আছে, ভাবি একটু।”
ভেবেছিল কল্পক। স্বামী বিবেকানন্দ। গেরুয়া পােশাক, গেরুয়া পাগড়ি পরে হাত দুটো বুকের কাছে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। হে বীর, সাহস অবলম্বন কর, সদর্পে বল, আমি ভারতবাসী; ভারতবাসী আমার ভাই...' ইত্যাদি।
জয়দীপ জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই সাজবি না?”
“না-না, আমি সাজব না।” কল্পক বলেছিল, “আমার লজ্জা করে
লজ্জা নয়, আসলে নতুন স্কুলে এখনও ঠিকমতাে মানিয়ে নিতে পারেনি সে। না হলে আগের স্কুল গঙ্গাধর বিদ্যানিকেতনে পড়ার সময় দু’বার গাে অ্যাজ ইউ লাইকে নাম দিয়েছিল; প্রাইজও পেয়েছিল একবার। কিন্তু এটা তাে নতুন স্কুল। ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছে এবছর। ক্লাস করেছে মাত্র ক'টা দিন; একটা ছেলের সঙ্গেই ঠিকমতাে বন্ধুত্ব হয়েছে। সে জয়দীপ।
কল্পকের বাবা হঠাৎ বদলি হয়ে এসেছেন কমলপুরে। বাবা যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সেই কোম্পানির নতুন প্রজেক্ট হচ্ছে। এখানে। বেশ ক'বছর থাকতে হবে। পুরনাে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। তাই। উহ, সে যে কী কষ্ট! নবারুণ, তৃণাঙ্কুর, স্নিগ্ধদীপ, জিষ্ণু, ঋভু, কিন্নর কত বন্ধু। সবাইকে ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। সবাই বারবার বলছিল, “চলে যাবি কল্পক; তাের বাবাকে বল না; কোম্পানিকে বুঝিয়ে বলতে, ইশ, তােকে খুব মিস করব ।
কল্পক কী বলবে! বাবার বদলির কথা যখন শুনল তখনই তাে সে বলেছিল, “কিন্তু বাবা, আমার স্কুল?”
বাবা বলেছিলেন, “এখন অগস্ট, এ বছরটা তুমি এখানেই পড়বে, মায়ের সঙ্গে থাকবে; আমি ক’টা মাস অফিস ক্যান্টিনে খেয়ে চালিয়ে নেব। তারপর সামনের জানুয়ারিতে নতুন সেশন শুরু হলে কমলপুরের স্কুলে। ভর্তি করে দেব তােমাকে। আমি খবর নিয়েছি, আমাদের সাইটের খুব কাছেই একটা স্কুল আছে, বেশ ভাল স্কুল, গত বছরই একটা ছেলে টেস্থ হয়েছিল, ওই স্কুলেই নাইনে ভর্তি হবে তুমি।” 
স্কুল, বন্ধু সব ছেড়ে নতুন জায়গায় চলে যেতে হবে ভেবে চোখে জল এসে গিয়েছিল কল্পকের। বলেছিল, “বাবা, তােমার ট্রান্সফারটা ক্যানসেল করানাে যায় না?”
 বাবা বলেছিলেন, “কোনও উপায় নেই, আমাদের চাকরির শর্তই এটা। তবু তাে আমি টানা আট বছর এক জায়গায় থাকলাম, এতদিন। একটানা একজায়গায় কেউ থাকে তাই গঙ্গাধর বিদ্যানিকেতন ছেড়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সে। সত্যিই স্কুলটার স্ট্যান্ডার্ড বেশ ভাল, কয়েকটা ছেলে বেশ শার্প, কয়েকদিন ক্লাস করেই বুঝে গিয়েছে। কল্পক। আগের স্কুলে স্ট্যান্ড করত সে, এখানে সেটা কঠিন হবে।
ক’দিনে আর-একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে কল্পক। ক্লাসের ছেলেগুলাে তেমন মিশুকে নয়। কয়েকটা গ্রুপ আছে ক্লাসে। গ্রুপের মধ্যেই সবসময় গল্পগুজব কথাবার্তা, বই, খাতা আদান প্রদান চলে।
নতুন ভর্তি হয়েছে কল্পক; কিন্তু কেউই এগিয়ে এসে ভাব জমায়নি। প্রথম চার-পাঁচদিন পর বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিল কল্পক। এ কেমন ব্যাপার রে বাবা; কারও সঙ্গেই তাে বন্ধুত্ব হচ্ছে না। কল্পক নিজে থেকে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কেমন যেন দায়সারা উত্তর পেয়েছে। খুব হতাশ হয়ে পড়েছিল সে। আগের স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি হয়েছিল কিন্নর। মনে।
আছে, প্রথমদিনই তারা চারপাঁচজন কিন্নরের কাছে গিয়ে নামটাম জিজ্ঞেস করে ভাব জমিয়ে নিয়েছিল।

কিন্তু এখানে তাে কেউই তেমন করছে না। তা হলে কি নতুন ইস্কুলে বন্ধুই হবে না তার? তখন আরও বেশি করে মনে পড়ে যাচ্ছিল পুরনাে ইস্কুলের কথা। পুরনাে বন্ধুদের কথা।
 সেই সময়েই জয়দীপের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সেদিন টিফিনের সময় একা বসেছিল কল্পক। টিফিন খেয়ে একটা উপপাদ্য দেখছিল। একটা ছেলে বসল পাশে এসে। ছেলেটাকে আগে দেখেনি কল্পক। সম্ভবত প্রথম ক’টা দিন অ্যাবসেন্ট ছিল। পাশে। বসে ছেলেটা বলল, “তােমার নাম কল্পক তাে?”
কল্পক বলল, “হ্যাঁ, কল্পক ব্যানার্জি।”
ছেলেটা বলল, “আমি জয়দীপ। তােমার আর আমার রােল নম্বর পরপর, আমার উনপঞ্চাশ আর তােমার পঞ্চাশ।” 
কল্পক বলল, “তুমিও কি নতুন ভর্তি হয়েছ?”  “না-না, আমি ফেল করেছি।
 নিজের ফেল করার সংবাদটা। প্রথম দিনই ভারী নিস্পৃহভাবে দিয়ে দিয়েছিল জয়দীপ। একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল কল্পক। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। | জয়দীপই অস্বস্তি কাটিয়ে দিয়েছিল। হেসে বলেছিল, “সামনের বার তােমার রােল প্রথম দিকে চলে যাবে, দেখে নিয়াে।” 
কল্পক বলেছিল, “তােমারও তাে যেতে পারে; একবার ফেল হয়েছে।
 তাে কী হয়েছে। কোনও কারণে হয়তাে প্রিপারেশন ভাল হয়নি।”
“দুরদুর, প্রিপারেশন। আবার কী?” জয়দীপ বলে উঠল,
“লেখাপড়া ভাই আমার মাথায় ভাল ঢােকে না; পড়তে ভালও লাগে না। যাক গে, তুমি ফেল করা ছেলের
সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে তাে?” 
“নিশ্চয়ই, সে কী কথা!” বলে উঠল কল্পক।
 “এখানে ভাল ছেলেরা আবার ডবগা পাওয়াদের সঙ্গে মেশে না। বিরাট ঘ্যাম সব। তুমি যদি বন্ধু হও তাে ভাল; না হলে, একটা বছর দেখতে-দেখতে কেটে যাবে। একটা বছরের ব্যাপার তাে মােটে।”
কল্পক একটু অবাক হয়ে বলল, “একটা বছর কেন! 
 “এই স্কুলে পরপর দু’বছর ফেল করলে রাখে না; টিসি দিয়ে দেয়। আমার তাে একবছর হয়ে গেছে, পরের বারও ফেল করব।”
কল্পক বলে, “না-না, ফেল করবে কেন! একটু মন দিয়ে পড়াে; ক্লাসে। স্যারেরা যা বলেন মন দিয়ে শােনাে, তারপর টিউটরের কাছে সেগুলাে প্র্যাকটিশ করাে।
“টিউটর!”
“হ্যাঁ, প্রাইভেট টিউটর; যাদের কাছে টিউশন নাও তুমি।” বলে কল্পক।।
“ধুস, আমার টিউটরফিউটর নেই কিছু।”
 একটু অবাক হয়ে কল্পক বলে, “তুমি টিউশন নাও না? বিশেষ করে ভাইটাল সাবজেক্টগুলাে, অঙ্ক ইংরিজি, সায়েন্স!”
“না-না,” জয়দীপ বলে, “প্রাইভেট টিউটর নেই আমার।”
ঠিক তখনই কল্পকের চোখে পড়ে জয়দীপের জামার কলারটা ফাটা আর বুক পকেটের নিচে একটা রিফু। ওই রিফু আর ফাটা কলারই যেন বলে দিচ্ছে, কেন জয়দীপের প্রাইভেট টিউটর নেই। সে তাই বলে, “ক্লাস টিচারদের নােটস ফলাে করলেও অবশ্য হবে; পাস মার্ক ভালভাবেই উঠে যাবে।”
 জয়দীপ বলে, “ঠিক আছে, বলছ যখন এবার উঠে পড়ে লাগব; পাস করতেই হবে। পাস করলে আর কিছু
হােক, তুমি আমি আরও একটা বছর একসঙ্গে পড়তে পারব।”
তারপর কটা দিনেই বন্ধুত্বটা জমাট বেঁধে গেল দু’জনেই। পাশাপাশি বসা, টিফিন ভাগ করে। খাওয়া, ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’। এর মধ্যেই নােটিশ পড়ে গেল ক্লাসে ক্লাসে। স্পাের্টসের নােটিশ। জানুয়ারি সাতাশ, আঠাশ স্পাের্টস্। উনত্রিশ তারিখে গাে অ্যাজ ইউ লাইক। গাে। অ্যাজ ইউ লাইক, টিচারদের টাগ অব ওয়র দিয়ে স্পাের্টস শেষ। তারপর।

প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন। এই গাে অ্যাজ ইউ লাইকেই সাজার কথা ছিল। জয়দীপের। কী সাজবে সেই যুক্তি করেছিল দু’জনে। কল্পক বলেছিল, “দাঁড়া একটু ভাবি; ভেবে বলব।” 
ভেবেও ছিল কল্পক। স্বামী বিবেকানন্দ, কিন্তু সেই ভাবনার কথা জয়দীপকে বলা হল কই! পরদিন। থেকেই তাে স্কুলে আসছে না সে। একদিন-দু’দিন করে দেখতে-দেখতে স্পাের্টস এসে গেল। জয়দীপের। দেখা নেই। কী হল ছেলেটার? কঠিন কোনও অসুখ বিসুখ? বাড়ি বলেছিল কমলপুর জোড়া মন্দিরতলায়। জায়গাটা কোথায় জানে না কল্পক। কমলপুরের কতটুকুই বা সে চেনে! ক্লাসের কয়েকজনকে কল্পক জিজ্ঞেস করেছিল জয়দীপের কথা। কেউ কিছু বলতে পারেনি। একজন তাে চিনতেই পারল না জয়দীপকে। ফোন নম্বরটাও নেওয়া হয়নি। এখন আফসােস হচ্ছে। ইশ, নম্বরটা যদি নিয়ে রাখত। 
 স্পাের্টসের প্রথম দু’দিন মাঠে যায়নি কল্পক। কী হবে গিয়ে! নিজে নাম দেয়নি, তেমন বন্ধুও কেউ হয়নি যার সঙ্গে একটু গল্পটল্প করবে। কিন্তু আজ সকাল থেকে কেবল মনে হয়েছে, একবার গেলে হয় মাঠে; আজ গাে অ্যাজ ইউ লাইক; জয়দীপ বলেছিল সাজবে। গাে অ্যাজ ইউ লাইকে তাে নাম দেওয়ার দরকার নেই; সেজেগুজে মাঠে চলে গেলেই হবে। বলা যায় না, হয়তাে জয়দীপের মাথাতেই কোনও প্ল্যান এসেছে; সেইমতাে সেজেগুজে মাঠে চলে এল।
তাই কল্পক এসেছে মাঠে। একাএকা ঘুরছে আর যারা সেজে মাঠে আসছে তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে দেখছে। জয়দীপ নাকি? 
মাঠের উলটো দিকে ছােটখাট ভিড় একটা। কে নাকি রবীন্দ্রনাথ সেজেছে। তাড়াতাড়ি পা চালাল কল্পক। গিয়ে দেখল রবীন্দ্রনাথকে। না, জয়দীপ নয়। তবে তাদের ক্লাসেরই ছেলে। ধপধপে সাদা চুল, সাদা গোঁফদাড়ি, পরনে জোব্বা ধরনের পােশাক। সামনে ছােট কাঠের চৌকির উপর খাতা রেখে একদম আসলের মতাে। ছাত্ররা সবাই চলে গিয়েছে। স্যারেরাও চলে যাচ্ছেন একে-একে। শীতের দিনের সূর্য এর মধ্যেই হেলে পড়েছে। মাঠের এক কোণে বসে কল্পক আর জয়দীপ। পাশে ফাঁকা ঝালমুড়ির টিন।
 কল্পক বলল, “স্কুলে আসছিস না কেন?”
একটু চুপ করে থেকে জয়দীপ বলল, “কখন আসব?”
“কেন?”
“ঝালমুড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে যে!”
 ঝালমুড়ি, মানে?” কল্পকের গলায় প্রবল বিস্ময়। 
জয়দীপ বলে, “বাবা বিক্রি করত ট্রেনে। কিন্তু ক'দিন আগে ট্রেন থেকে পড়ে গেছে। মারাত্মক চোট, একটা পা বাদ গেছে। এখনও হাসপাতালে। আর কোনওদিন কাজে বেরতে পারবে না। তাই আমাকেই বেরতে হচ্ছে। আজ সকালেও বিক্রি করেছি। দুপুরে ভাত খেতে এসেছিলাম,
 মনে হল, আজ তাে গাে অ্যাজ ইউ লাইক, ঝালমুড়িওয়ালাই সাজি; তাের সঙ্গেও দেখা হতে পারে। ফার্স্ট হয়ে যাব, ভাবিনি। যাক, একটা আফশােস ছিল, স্কুল থেকে কোনওদিন প্রাইজ পাইনি; শেষ।
পর্যন্ত পেলাম একটা।”
কথা বলতে পারে না কল্পক। শুধু তাকিয়ে থাকে জয়দীপের দিকে।
মৃদু হেসে জয়দীপ বলে, “দেখ, লেখাপড়া তাে বেশি কিছু হত না আমার; ঝালমুড়িই হয়তাে বিক্রি করতাম শেষ পর্যন্ত; একটু আগে শুরু করে দিলাম, এই যা। যাক, ট্রেনে যদি কোনওদিন দেখা হয় এই ঝালমুড়িওয়ালাকে চিনতে পারবি জয়দীপের হাতটা চেপে ধরে কল্পক। বুকের মধ্যে একটা কষ্ট পাকিয়ে উঠছে।
জয়দীপ বলে, “তুই হয়তাে বড় এক অফিসার হয়ে গেছিস তখন কিংবা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিছু একটা; পারবি তাে চিনতে ঝালমুড়িওয়ালাকে?” 
 বুকের কষ্টটা চোখের জল হয়ে। ফোঁটা-ফোঁটা নেমে আসে কল্পকের গাল বেয়ে। আরও শক্ত করে সে চেপে ধরে জয়দীপের হাত। তার ওই নিবিড় চেপে ধরা হাত আর চোখের জল যেন ফিসফিস করে জয়দীপের কানের কাছে বলছিল, ‘পারব রে, পৃথিবীর যেখানে যে অবস্থাতেই তােকে দেখি, ঠিক চিনতে পারব দেখে নিস বন্ধু।

Labels:

আনন্দমেলা ২০ অক্টোবর ২০২২ পিডিএফ Anandamela 20 October 2022 pdf

আনন্দমেলা ২০ অক্টোবর ২০২২ পিডিএফ Anandamela 20 October 2022 pdf download link

সূচীপত্র
১০টি গা-ছমছমে ভূতের গল্প
রক্ষক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী ৬
অভয় লজ প্রচেত গুপ্ত ১৪
ন্যাটা উল্লাস মল্লিক ২০
রাতের আহ্বান ইন্দ্রনীল সান্যাল ২৪ 
রহস্যময় পােট্রেট রাজেশ বসু ২৮ 
ক্ষীর-চাল অদিতি ভট্টাচার্য ৩২ 
নৌকোডুবির বিল জয়দীপ চক্রবর্তী ৩৮ 
মােটরবাইকের শব্দ বিপুল দাস ৪৪ 
মানুষ চতুর্দশী ধ্রুব মুখােপাধ্যায় ৪৮ 
রুপাের মাদুলি বিতান সিকদার ৫২

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস 
পাণ্ডব গােয়েন্দা ষষ্ঠী পদ চট্টোপাধ্যায় ৩৬
ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
অশ্বারোহী ঈশ্বর রুপম চট্টোপাধ্যায়

কমিক্স
দস্যি ডেনিস ৩১ 
নিয়মিত বিভাগ
আমার কুইজ ৫ আমার ছবি ৯ মজার ঝাঁপি ১৭ খুদে প্রতিভা ১৮ শব্দসন্ধান, নিজের হাতে ২৩ ফারাক পাও, সুদোকু ২৭ আমার ইচ্ছেমতাে ৩৫ যা হয়েছে যা হবে ৪৭ নতুন খেলা ৫৮
ধারাবাহিক
আমার বাবা সত্যজিৎ রায় সন্দীপ রায় ১০
ঘনাদা কমিক্স ৫১
লাট্ট কাহিনি:প্রেমেন্দ্র মিত্র ছবি:শুভ্র চক্রবর্তী
বিজ্ঞান
হিমাচলে নতুন মাছি ৫৬
খেলা ধুলাে 
ঝুলনের অবসর সায়ক বসু ৫৭

ABP এর pdf book আনন্দমেলা ২০ অক্টোবর ২০২২ পিডিএফ Anandamela 20 October 2022 pdf download করুন এখান থেকে। 

Labels:

আবাহন - কৌশিক পাল Abahan pdf by Kawshik Pal

আবাহন pdf download link - কৌশিক পাল Abahan pdf by Kawshik Pal

অগস্টের প্রথম সপ্তাহ, রবিবারের আর-একটা সকাল
আজ সকাল থেকেই একটা হইহই ব্যাপার। ক্লাবের ছাদে চোঙা বাঁধা হয়েছে। চারদিকে মুখ করে চারটে। মিউনিসিপ্যালিটির জমাদার গদাধরদাকে ডেকে ক্লাবের আনাচে-কানাচে জমে থাকা ঝুল ঝাড়ানাে হচ্ছে। এর পর ভাল করে ঝাঁটিয়ে, ধােয়া হবে গােটা ক্লাবঘর। ক্লাবের। বিভিন্ন দেওয়ালে লাগানাে মান্ধাতার আমলের ছবিগুলােও পরিষ্কার করতে হবে। আজ সন্ধেবেলা যে এসপিএল-এর নিলাম! এসপিএল— শ্রীপল্লি প্রাইম লিগ! লাইভ অ্যান্ড এক্সক্লসিভ টেলিকাস্ট ফ্রম আওর ওন ক্লাবহাউজ!’ ক্লাবের বাইরের চাতালে মাউথপিস হাতে বসে, সেই কথাই অনবরত ঘােষণা করে চলেছে বান্টিদা। যা সরু তারের মধ্যে দিয়ে ছাদের চোঙা পর্যন্ত পৌঁছে ছড়িয়ে পড়ছে সারা পাড়ায়।
পাড়ার মান্যগণ্য অতিথিরা আজ আসবেন ক্লাবে। তাই তাদের জন্য প্লাস্টিকের খান পনেরাে চেয়ার নিতে এসেছি ‘গুল্লু-বিন্দু ডেকরেটার্স’-এ। গুল্লু আর বিন্দু কল্যাণদার দুই ছেলে, তাদের নামেই ব্যবসা। কল্যাণ ঘােষের দোকানটা আমাদের ক্লাবের খুব কাছেই। কল্যাণদার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। লােকটা এমনিতে একটু খিটখিটে, মুখের ডগায় ‘হবে না’ কথাটা সর্বক্ষণ ঝুলে রয়েছে। তবে মনটা ভারী ভাল। এই যেমন আমাদের ফুটবল টুর্নামেন্টের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। বলেছে, “যাক, বহুদিন পর পাড়ায় ভাল কিছু একটা হচ্ছে! ভাল, ভাল।
মুখে অনেকেই অনেক কিছুকে ভাল বলে, কিন্তু কল্যাণদা যে মন থেকে খুশি হয়েছে, সেটা বােঝা গেল তার পরের কথাতে, যখন জিজ্ঞেস করা হল, “চেয়ারগুলাের জন্য কত দিতে হবে গাে কল্যাণদা?”
কল্যাণদা তাঁর ছােট্ট অফিস ঘরের সামনে জলের ছিটে দিতে-দিতে বলল, “বিকেলে নিয়ে রাতে ফেরত দিবি তাে? ও কিছু দিতে হবে না। নিয়ে যা। কাজ হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে যাস। তবে দেখিস, ভাঙাভাঙি করিস না যেন! তা হলে কিন্তু পাই-পয়সা বুঝে নেব।” তার পর গলা নামিয়ে হাতের ইশারায় আমাকে ডেকে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তপনটা কী বলছে রে?” বললাম, “কিছু না, একটু গুম মেরে আছে। দু’দিন হল, ক্লাবে পা
রাখেনি।”
পাশ থেকে বিটু বলে উঠল, “তুমি আমাদের ফ্রি-তে চেয়ার দিচ্ছ শুনলে, ওর বাড়ির বিশ্বকর্মা পুজোয় কিন্তু প্যান্ডেল করে, চেয়ারটেবিল দিয়ে আর একটি পয়সাও পাবে না কল্যাণদা...”
কল্যাণদা ঠোট উল্টে বলল, “কত যেন দেয়! যাক, তােরা এখন যা, আমার আর মুখ খােলাস না। মেলা কাজ পড়ে আছে।”

“কল্যাণদা, টাকা যখন পাও-ই না, তখন তুমি কেন করাে ওর বাড়ির কাজগুলাে?” ছেলেমানুষের মতাে প্রশ্ন করল বিটু।
“ও তােরা বুঝবি না রে, ব্যবসাটা তাে চালাতে হবে। না হলে খাব কী? পার্টির কাজগুলাে তাে ওর সূত্রেই পাই। ধরে নিই, ওর বাড়ির কাজগুলাে আমার নজরানা!”
কল্যাণদার কথাগুলাে শুনে মনটা কেমন যেন করে উঠল। এখন আমার বিলুদার উপর খুব রাগ হচ্ছে, ও যে কেন এত কল্যাণদার পিছনে লাগে! শুধু বলে, ‘শ্রাদ্ধের প্যান্ডেল করার জন্য আমাদের কল্যাণদার জুড়ি নেই! সাদা কাপড় দিয়ে কী দারুণ গ্যারাজ ঘেরে!' এর পরের দিন করলে, আর কেউ না হােক, আমি বিলুদাকে বাধা দেব। ক্লাবে ফিরে দেখি, একতলাটার পুরাে ভােল বদলে গিয়েছে! এটা কি আমাদের ক্লাব? চিনতেই পারছি না! কোথাও সিগারেটের টুকরাে, পােড়া দেশলাইয়ের কাঠি পড়ে নেই। মেঝেয় পুরু ধুলাের স্তর নেই। কাগজের টুকরাে নেই। নেই, চি-বাদামের খালি প্যাকেট। কোনও দেওয়ালের কোণে কোথাও একটুও ঝুল ঝুলে নেই। সামান্য একটা পাড়া-ফুটবলকে কেন্দ্র করে আমাদের ক্লাবটা যে এমন নবকলেবরে। সেজে উঠবে, সেটা দেখে সত্যিই খুব আনন্দ হচ্ছে। কোনও একটা পজিটিভ কাজের কত অনুসারী এফেক্ট যে হতে পারে, তা যেন আমাদের আজকের এই ক্লাবঘরটিকে দেখেই বেশ বােঝা যাচ্ছে। | যদিও শান্তুদা এক হাতে ক্রাচ নিয়ে লেংচে-লেংচে এ-দিক ও-দিক করে বেড়াচ্ছে আর বলছে, “শালা, ওকে আমি ছাড়ব না। কত দিন পর একটা টুর্নামেন্ট খেলার সুযােগ এল আর দিল সব ভােগে পাঠিয়ে..”
আসলে সেদিন টুর্নামেন্ট নিয়ে আলােচনার সময় ক্লাবঘরে শান্তুদা একটা সােফায় বসে পা-টা ছড়িয়ে দিয়েছিল, উল্টো দিকে রঘুদারা যে সােফায় বসেছিল তার তলায়। বিখ্যাতকাকু আচমকা ঢুকে আসায় যখন রঘুদাদের সােফার পায়া ভাঙল, তখন তার তলাতেই চাপা পড়ে শান্তুদার পা। ভাগ্য ভাল, ব্যাপারটা শুধু বাম পায়ের উপর দিয়েই গিয়েছে! ভাঙেনি, জাস্ট হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার। তবে এই ‘ভাগ্য ভাল কথাটা বলায় আমাকে বেদম ঝাড় খেতে হয়েছে সকলের কাছে। ওদের বক্তব্য, “শান্তুর ভাগ্য ভাল হলে বিখ্যাতকাকু এই পাড়ায় নয়, অন্য পাড়ায় জন্মাত।
রঘুদা সৌজন্যদাকে বলেছিল, “হল তাে, হাতে-নাতে প্রমাণ পেলি তাে? শালা একেই প্লেয়ার কম, তার মধ্যে একটাকে শুরুতেই মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিল।”
সৌজন্যদা নিচু গলায় বলেছিল, “তিন জনের সােফায় তােরা সাত জন বসলে ওই ভদ্রলােকের কি আর বিশেষ কিছু করার প্রয়ােজন আছে রে?”
“তুই শালা এখনও বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না। এর পর যেদিন নিজে বাম্বু খাবি ওই মালটার জন্য, সেদিন বুঝবি,” বেশ রেগে গিয়েই কথাগুলাে বলেছিল বিলুদা।
সে কথায় পাত্তা না দিয়ে সৌজন্যদা একটা চোখ টিপে বলেছিল, “তা হলে নিলামের দিন ক্লাবে আসার জন্য তােদের বিখ্যাতকাকুকে আলাদা করে ইনভাইট করব না বলছিস?”
“এই বিষয়টাকে নিয়ে চ্যাংড়ামাে করিস না ভাই... ওই একটা মানুষ কিন্তু একা সব ভেস্তে দিতে পারে!” ধরা গলায় বলেছিল রঘুদা।

বইটি ডাউনলোড করতে এখানে ভিজিট করুন।

Labels: