রাউটার - তিলোত্তমা মজুমদার Router by Tilottama Majumdar
অবশেষে আমি আর ও বেরিয়ে পড়লাম। জানালা হাটখোলা রইল। পাখি আসেনা আর। দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনও নেই। কুকুর-বেড়াল ঢােকে না। ইলেকট্রনিক্সে ওদের কোনও আগ্রহ নেই। শেষ দানা পড়ে থাকা পর্যন্ত লােক আসত। আর আসে না। তাতে কিছু না। ও লােক চায় না। আমি চাই একটু-আধটু, যদি কথার মধ্যে আলাে ফুটতে দেখি, আমার ভাল লেগে যায়। আলাের সুঘ্রাণে বিমােহিত আমি কত বার ভুলে গেছি উনুনে চাল ফুটছে, আর সেই সব স্ফুরিত তণ্ডুল আগুনের কাছে নতজানু, নরম হতে হতে, গলে গলে, ব্যক্তিসত্তা থেকে মণ্ডসত্তায় পরিণত হয়েছে। যেহেতু আগুন নেভানাের কেউ নেই, জল। দেওয়ার বা হাঁড়ি নামিয়ে ফেলার ক্ষমতা নেই কারও, তণ্ডুলের সেই সকল গণমণ্ডসত্তা পুড়ে আংরা।
চোরও আর সাধারণ গেরস্থ বাড়িতে আসে । তারা ডাকাতের বাড়ি যায়। আর ডাকাতরা। যায় গদ্দা বানানাের কারখানায়। তাদের যে রাশি রাশি ধনরাশি। গদ্দাগুলি যখন ধনভারে মেঝে ফাটিয়ে দেয় তখন ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, কমােড সব জায়গায় কেবল আলি আর কাশেম, কাশেম আর আলি। | আমাদের শেষ দানা থেকে ভাগ নেওয়ার জন্য শেষ তিন জন এসেছিল। তখনও আমি ভাঁড়ারের খবর বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। খুব বিশ্বাস ছিল, সব ঠিক আছে। কিছু ইদুর গর্ত থেকে বেরােবেই, সাপেরা খাবে ব্যাং, ব্যাঙের জিভে আশ্চর্য আঠায় লেপটে যাবে ফড়িং ও কাচপােকা, কিন্তু আমরা ঠিক থাকব। আমি ও এ সে। আর সেই নিয়ে কত কথা, তর্ক, টেবিল চাপড়, এক জন রেগে থুতু ফেলল আর-একজনের মুখে, আমি তাকে রুমাল ধার দিলাম, সে দিব্যি রুমালের পরিবর্তে কিছু না দিয়ে সটকে পড়ল।
ও বলে, ওই জন্যই আমি তােক পছন্দ করি। । শুধু কথা আর কথা। শুধু অর্থহীন বানানাে কথা। ওহ, কী ক্লান্তিকর! কথা না বলে শুধু কাজ করলে হয় না? | আমি বিভ্রান্ত বােধ করি। এর ঘরে তার ঘরে। লােক আসে, এমনটাই দেখি। যা দেখি, তাই স্বাভাবিক বলে ভাবি। স্বাভাবিক বলেই তাে ঘটে, নাকি স্বাভাবিকতা ঘটিয়ে তােলা হয়। বিষয়টা গােলমেলে। ঘটিয়ে তুললে তাে কৃত্রিম হয়ে গেল। তখন স্বাভাবিক পাই কোথায়?
ও বলে, স্বাভাবিকের দরকার কী! কম্পিউটার আছে যখন।
আমি বলি, তা হলে কম্পিউটার হল স্বাভাবিক।
আরে, স্বাভাবিক বলে কিছু হয় না, এটাই মেনে নে। কাকে বলে স্বাভাবিক? তার। প্যারামিটার কী?
আমার এক বােন সুদূর মফসসলে প্যারাটিচার, আমার দু’বার প্যারাটাইফয়েড হয়েছে, তখন প্যারামেডিক্স আমার চিকিৎসা করেছেন, প্যারাসাইকোলজি বিষয়টা আমাকে খুব টানে কারণ তার জন্য কোনও যুক্তি লাগে না। ও প্যারামিটারের কথা তুলতেই আমি বললাম, প্যারাফুট হলে চলে না?
ওর মুখ দেখেই বুঝলাম ব্যাপক ভুলভাল। করেছি, তাই সুট করে প্যারাশুটের মতাে ভেসে। গেলাম। ও অযথা কথা বলা নিষ্ফল জ্ঞানে কাজে ফেরে। কিবাের্ডে ঝােড়াে আঙুল চালায়, আর ওর মুখ ঢুকে যায় স্ক্রিনে। অহাে, ওই দৃশ্য, ও যেন এক স্কন্ধকাটা, আমাকে ভারী উত্তেজিত করে। বুঝি না কম্পিউটার ওকে গেলে, নাকি ও গেলে যন্ত্রটাকে।
এ রকম চলতে চলতে এক দিন আমার সে। কী মাথা গরম! রাগ নয়। মাথাটা কেমন সদ্য সেদ্ধ করা গরম আলুতে ঠাসা মনে হল। কে যেন বলেছিল, বাসন মাজলে চিন্তার স্বচ্ছতা আসে, পায়ে জল ঢাললে আসে শান্ত বিনয়। তাে আমি পায়ে তিন মগ জল ঢেলে চালের চিতা জ্বালিয়েছি। যে-হাঁড়িতে, তার পােড়া দাগ তােলার জন্য স্কচ ব্রাইট ঘষছি তাে ঘষছি, আমার হাত ছড়ে গেল, ফোস্কা পড়ল, আমার ঘাড় টনটন করল, কিন্তু। দাগ উঠল না। কত কী ঘষি আমি আয়নার কাছে। দাঁড়িয়ে কলার খােসা, লেবুর খােসা, পেঁপের। শাঁস, ডাবের জল, কিন্তু ভ্রান্তিমূলক দাগ যায় না।
দাগ তুলে আপামর মসৃণ ও সফেদ হয়ে যেতে পারি না আমরা? পারি না? পারি না?
আমার পরিচারিকা বলে আজ আসব না গম দেবে, কাল আসব না চিনি, পরশু ছােলা, তরশু আলু। সাবান টুথব্রাশ খাতা আর বই। সব খাতা আসলে ইস্তাহার। সব বই আসলে অন্ধ। আর প্রতি ভােরে সাত-ঘােড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে চাল। দিয়ে যায় এক জন। খেলার শর্ত মাত্র কয়েকটা। হাত পাতাে, পাতাে হাত, মাথা নুইয়ে দাও আর চালের গান করাে। চলন রাখাে মিছিলপানে। চালিয়াত হয়ে যাও। চালিহাত জালিহাত সব হাত ভাগ্যরেখায় ভরপুর। কে করে? আমিই-ই। কে দেয়? আমিই-ই। সব ঠিক থাকবে যত দিন আমি থাকব চালিকাশক্তি।
আমি সেই সপ্তাশ্ব রথ দেখিনি। দেখলেই এক লক্ষে রথের মাথায় উঠে বসব দেখতে যে, ওখানে। প্লাস্টিকের ছাউনি আছে কি না।
সে দিনও, ওই আকাট চিন্তাসমেত, কবে হনুমান লঙ্কা পুড়িয়ে জ্বলন্ত লেজ মুখে পুরেছিল, সেই কালি অদ্যাবধি, এমত বিচক্ষণ বিষয়সমেত আমি চলেছি অন্ধকারে। ভাবছি, ঘরে ফিরে। জানতে চাইব, কম্পিউটারের ভিতরটা কেমন, তখন, ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন তিমিরে ঘ্যাঁক করে আমাকে কামড়ে দিল একটা ট্রাক। কখন এল? শুনতেই পাইনি। এমনিতে ট্রাকেরা ভেঁপু বাজাতে খুব। ভালবাসে, কিন্তু রাত্তিরে কখনও কখনও তারা। শব্দহীন। তাই কামড় খেয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আমি পথের ধারে পড়ে রইলাম। আর ট্রাক থেকে নামতে লাগল বিশাল বিশাল বস্তা। দিব্যি হাতপাওয়ালা বস্তাগুলাে ঢুকে পড়ছে এ বাড়ি ও বাড়ি।
এই এই, ওদের মধ্যে কী আছে রে? কী আছে?
চুপ। যাই থাক, তাের কী!
একেবারে পিন্ডিকেটের মতাে কড়া ও ঘরঘরে স্বরে আমাকে বলা হল। পিন্ডিকেটের এই সদম্ভ স্বর আমি চিনি। প্রথম বার শুনেছিলাম রাস্তায়, অটো-রিকশার লাইনে, ভয়ে আমার পেচ্ছাপ পেয়ে গেছিল। দ্বিতীয় বার শুনেছি যখন আমি, স্রেফ সরলতায় বলে ফেলেছিলাম, কুত্তার মতােই, আমার দৃষ্টিতে কোনও রং নেই সাদা আর কালাে ছাড়া। পিন্ডিকেটের বিকট হাসি, এবং খোঁচা, শালা, নিরপেক্ষতার চুতিয়াবাজি? আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে বললাম, দেখার মতাে কোনও রং না-পেলে আমি কী করব?
এক প্রবল শক্তি আমার ঘাড় ধরে, দুধ চুরি করা অপরাধী বেড়ালছানার মতাে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল, আমার প্রতিবাদের ভাষা নেই, আমার।
হাঁড়িপােড় আগুন নেই, আমার রং নেই, তুলি নেই, ছুরি নেই, গাঁইতি নেই, আমি চিৎকার করে বলতে চাইছিলাম, আমি কর দিই, নিয়মিত, কখনও আইন ভঙ্গ করিনি, ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়েছিলাম, শুধে দিয়েছি সুদে-আসলে, আমি এক জন সৎ সৎ সৎ, দুম দুমাস, আমার স্বরভঙ্গ হয়ে গেছিল কখন, অবিকল ভৌ ভক মিউ মিউ ম্যাশহহ, ব্যস, আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি ভাঙা এটিএমএর সামনে। হাতে আমার এটিএম কার্ড। ভুলে গেলাম এ দিয়ে কী করব। ঝপাত করে কয়েকটা চামচিকে এসে পড়ল আমার গায়ে। কিচকিচিয়ে বলে, চাল দাও চাল দাও।
ভাগাে। অবিকল পিন্ডিকেটের মতাে গর্জে উঠলাম আমি। এ সবই কিন্তু পুরনাে কথা। ফ্ল্যাশব্যাক চলছে। তা, যে-পিন্ডিকেট আমায় বিন্দু বানিয়ে ছেড়েছে, আমি তার অনুকরণ করব না? না-করলে খাব কী! বাঁচব কী করে? যদিও বাঁচা যে কেন এত জরুরি, আমি বুঝতেই পারি না। আমার তাে মাঝে মাঝেই মরা পায়। ভয়ে মরা, লজ্জায় মরা, প্রেমে লাথ খেয়ে মরা। মরতে মরতেই বেঁচে | আছি। চামচিকে স্মরণ করিয়ে দিল, জীবন আমার
অধিকার। চাল দাও।
চাল মারার আর জায়গা পাও না? আমি তার পিন্ডি চটকে বললাম। সে নিজের তরে চটকানাে পিন্ডি দেখে বলল, ওতে যদি চাল থাকে, তা হলে ওটাই দাও না-হয়।
কী করব ভাবছি, কারণ পিন্ডি আমি চটকাচ্ছি। কতক রাতারাতি বাতিল নােট দিয়ে। সে সব অখাদ্য। চেটে, চুষে, চিবিয়ে, ঢকঢক করে গিলে, কোনও ভাবেই খাওয়া যায় না। এবং খাওয়া বেআইনি। চামচিকেদের সে সব বােঝাব বলে আঙুল তুলে সবে সবজান্তা ভাব আনছি, গায়ে এসে পড়ল একটা বাজ।
আরে এদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই নাকি? আমার কান ঠুকরে লাল করে বলে, চাল দাও, চাল। এত ক্ষণে আমার মধ্য থেকে কৌতুক উঁকি দিল। পাকস্থলীতে বন্দি রেখেছিলাম। বেড়ালের মতাে ঝুলন্ত ছিলাম, তখন গলনালী বেয়ে উঠে এসেছে। বলে ফেললাম, তুমি এমন চালবাজ কবে থেকে হলে? সে বলে, সেই সে দিন, সেই তখনকার কথা, যখন অনেক অনেক চাল ছিল খাদ্য দফতরের গুদামে, সেই সব আলােচাল। ভালচাল বােকাচাল বােলচাল জনে জনে বিতরণ করা হচ্ছিল, আমার পিসতুতাে বােন এক সিলিন্ডার গ্যাস পুড়িয়ে আধ কিলাে চাল সেদ্ধ করে এবং তার পর থেকে দারিদ্রসীমার চাল পাল্টে যাওয়ায় বেচারা গ্যাসে ভর্তুকি পায় না আর, তখন থেকে চালই জীবন, চালই মরণ, চালই উড়ান, চালই কীর্তন।
থামাে তাে, কথা চালাচালি ছেড়ে মূল চাল দাও দেখি হে চালবাজ। আমি বলি। আমার কণ্ঠে অপূর্ব পিন্ডিকেটি কালােয়াতি খুলেছিল তখন। বাজ বলল, ভয়ে ভয়ে বাঘে হরিণে যেমন এক ঘাটে জল খায়, আমি ও চামচিকে সব ফেলে চাল খাচ্ছিলাম। মােটা চাল, পােকা চাল, দুর্গন্ধ চাল, মুফতে যা পাওয়া যায়। তুমি কি মুফতের চাল ন, পাওনি?
আমি ক্যাবলা হয়ে বললাম, না, আমি যে সব ন, চাল দেখি সাদা। সব ট্রাক কালাে।
অকম্মার টেকি! বাজখাই উত্তর পেয়ে আমার মনে হল, এও পিন্ডিকেটের এক জন। কিন্তু সে বলল, আমি সব সময় আস্থা রেখেছি ইউনিয়নে।
তাে? আমি ঢোঁক গিলে বললাম, আমফানে। বুঝি তার মাথার চাল উড়ে গেছে?
সে বলল, সব চাল গেছে, সব সব সব। ই আছে উ নেই, নি আছে য় নেই। শ্রমিকরা দালাল হয়ে গেছে, দালালরা ব্যাঙ্ক ডিফল্টার, ব্যাঙ্ক হয়ে গেছে পাগলা গারদ, পাগলারা গরাদের বাইরে। গিয়ে ছড়াচ্ছে বীজধান, যা থেকে কোনও এক দিন আপেল ফলবে আর বেকার সমস্যার সমাধান। হবে বলে মনে করা হয়, তবু জমির দখল নিয়ে
পাগলে পাগলে কী লড়াই, ফলে কৃষকেরা কেউ চে আদালতে, কেউ গাছের ডালে গলায় দড়ি, কেউ পর ভিখিরি। বলে চাল দাও, চাল দাও।
এই অবধি বলে বাজটা আমার টুটি কামড়ে র বলল, ইউ ইউ ইউ, মনে রেখাে, এখন আর নিয়ন
ব্রণ নিয়নতন্ত্র নেই বলে লালে লাল করে দিলাম। ল না। এখন যা আছে ছাড়াে তাে!
তা হলে কি দেশে দুর্ভিক্ষ? আমি জানতে চাওয়ায় চামচিকে বললে, যখন ভিক্ষার দরকার ছিল না, তখন সকলকে গণভিখিরি করে দিলে। সব্বাই ভিক্ষুক হয়ে হাত পেতে দাঁড়ালে ভিক্ষে দেবে কে? শুনি? এরই নাম নিয়ো-নর্মাল দুর্ভিক্ষ। তা হলে কী করে মনে হল, আমি চাল দিতে পারি? আমার ঘরের হালচালও আমি জানি না যেখানে।
কারণ, তোমাকে দেখতে চালাকের মতো হলেও তুমি গবেট। তুমি এখনও আদর শো, ভালবাসা বাসি, সৎ প্রত্যাশী, হুঁ হুঁ ট্রা লা লা লা ইত্যাদি বিশ্বাস করো। তুমি নিজেই দেখেছ কালো ট্রাক। নিজেই দেখেছ ভরা বস্তা চার পায়ে হেঁটে যায় কোন বাড়ি।
ধরো, সেই সব বস্তায় সবচেয়ে জমাট দমালো সিমেন্ট, কিংবা নরকঙ্কাল, কিংবা বাজ ও ধনেশের ঠোঁট।
চালাকি কোরো না।
আমি এ বার পালাতে লাগলাম। উফ, সে দিন কী ভাবে ওদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি সে আমিই জানি। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে গিয়েই দেখি ও দরজার কাছে তিনটে রাউটার নিয়ে খেলা করছে। আমাকে বলল, ওয়াই-ফাই কানেকশন যাতে চব্বিশ ঘণ্টা থাকে, তা দেখা কি সরকারের কর্তব্য নয়? এই নিয়ে গণআন্দোলন করতে পারি না আমরা?
ওয়াই-ফাইয়ের দাবিতে গণ, কী বললি? আন্দোলন। গণতান্ত্রিক দেশে সব কিছুই গণ, তাই না?
আমি মহাবিস্ময়ে বললাম, গনোরিয়াও? ওটা অসুখ, আর আন্দোলন হল ইয়ে, সুখের খাল কাটা।
আন্দোলন? ওরে বাবা। রাস্তায় ধর্না, পুলিশের লাঠি, গুলি, কাঁদানে গ্যাস। আর কাঁদাস না আমাকে। আমি উদ্ভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, ভ্রান্ত, সম্ভ্রান্ত। ধ্যাত, মাথা খারাপ হল না কি? একমাত্র মাল্টিমিলিয়নেয়ার, রাজনৈতিক নেতা আর সেলেব্রিটিরাই সম্ভ্রান্ত।
সম্ভ্রান্ত মানে কি সম্যক রূপে ভ্রান্ত? ও আমার দিকে কটমট করে তাকাল। আমি দ্রুত অন্য প্রশ্নে চলে যেতে চেয়ে বললাম, সেলেব্রিটিরা কি চাল খায়?
নিশ্চয়ই খায়। উৎকৃষ্ট চাল। যা আমাদের ঘরে আর নেই। কত দিন বলেছি রেশন কার্ড আপডেট করিয়ে নে, তা হলে মুতে চাল পেতিস।
ও সব সময় আমাকে দোষ দেয়। যেন আমি একটা আর্মাডিলো। আর সহ্য হয় না। আমি রেশন কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, স্বাস্থ্য বিমা কার্ড, পাসপোর্ট, পোস্টকার্ড, ব্র্যান্ডেড বাজারের কার্ড সমূহ এনে ওর সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম, এই নে। এর নাম জীবন। যদি এই দিয়ে চাল আনতে পারিস, আমি কান কেটে দেব।
কার?
আমি সে কথায় না-গিয়ে বললাম, খিদে পেয়েছে। ও বলল, ঘুমো। ঘুম থেকে উঠে ও বলল, খিদে পেয়েছে। বললাম, পাঁউরুটি খা।
কোনও খবর রাখিস না, দেশে পাউরুটি তৈরি হয় না কত কাল। এখন আমাদের সব বেকারি, হয় বেকার নয় বােমা বাঁধে।
কী হবে এত বােমা দিয়ে? চিনের সঙ্গে যুদ্ধ?
আরে না, চিনেরা বােমায় মরে না। ও সব অন্য কাজে লাগে।
বাব্বা, কত জানিস তুই! সারা ক্ষণ কম্পিউটারে ঢুকে থাকলে এত জ্ঞানী হওয়া যায়?
হে হে।
ও খুব খুশি হল, ওর কম্পিউটারপ্রেম স্বীকৃতি পাওয়ায়। হেসে বলল, যন্তরটা আমার সব অভাব মিটিয়েছে, সব খিদে সামলেছে, কিন্তু কিছুতেই গান্ডুটা চাল দিতে পারে না।
অতএব আমরা বেরিয়ে পড়লাম থলে হাতে। ভিক্ষে করব, না কেড়ে নেব? ভিক্ষে,
লুঠপাট? কোনওটাই পাঠ্যপুস্তকে ছিল। আর যা পাঠ্যপুস্তকে থাকে না, তা আমি তােতাবুলবুলিময়নাকাকাতুয়া নাগরিক, আমি জানি না। তুমি যা শিখাবে তাহাই শিখিব, তুমি যা বলিবে তাহাই বলিব। আমি বলে কিছু নাই। সব
গন্ধ পাচ্ছিস? তাের নাক তাে কুকুরের মতাে, ও বলে।
আমি বলি, নাক কুকুরের মতাে নয়, ঘ্রাণশক্তি কুকুরের মতাে। গন্ধ শুকে শুকেই যাচ্ছি। তা ছাড়া...
তা ছাড়া?
আমি ওকে বললাম, কী করে আমি হেঁটে যেতে দেখেছি বস্তাদের। কী ভাবে পিন্ডিকেটের স্বর আমাকে ভয় পাইয়ে দাবিয়ে হিসি করিয়ে ঝুলিয়ে আমায় আদর শাে বাদ দিয়ে চলতে বাধ্য করতে চেয়েছে।
ও বলে, চালের বস্তার কথা আর কাউকে বলিসনি তাে?
বললাম, বলেছি, তবে ওতে সিমেন্ট থাকতে পারে, এমনটাই বলেছি।
তুই একটা বােকা গাধা। তুই বললি আর ওরা বিশ্বাস করল!
ও আমাকে বােকা গাধা বললে আমি কিছু মনে করি না, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চারপাশে। অতিকায় ঝিঝিপােকার মতাে ডিজে বাজে। আজও বাজল। আগে তাতে থাকত শুধু বােকা বােকা বােকা বােকা, গাধা গাধা গাধা গাধা। আজ সুর ছন্দ সব বদলে গেছে। ভিখিরি ভিকিরি ভিকিরি ভিখিরি। দে দে চাল দে চাল দে চাল দে রে, দে দে চাল দে।
ওই তাে। সােল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল ও। ওই দ্যাখ।
বিশাল চালের আড়ত। জগতের সব কিসিমের চাল এনে রেখেছে এরা। বস্তার পর বস্তার পর বস্তা। বস্তাগুলাের হাত-পা বাঁধা। আদুল-গা লােকগুলাের রকম দেখলে ভয় হয়। আমার পা ঠকঠক করে কাঁপছে। ও বলে, দেখেছিস?
হ্যাঁ। দেখেছি। দেখছি। চালের মধ্যে থাকতে থাকতে ওদের সারা গা ফুটে ঘামাচির মতো চাল বেরিয়েছে। বুকে, মুখে, হাতে, পায়ে, পিঠে। আমি বললাম, আমাকে কাজ দাও। কাজ করে দেব।
পেটচুক্তি। শ্রমের বিনিময়ে দাও চাল।
তারা হা হা করে হেসে বলল, কাজ? ফের কাজ চাইলেই গারদে পুরে দেব।
কেন? কাজ আমার সাংবিধানিক অধিকার। ও বলে, কথা বাড়াস না বোকা। চল। চাল না-নিয়ে নড়ছি না। আমার আকাট জেদ। কী অদ্ভুত বেপরোয়া জেদ রে বাবা! আমারই আমাকে ভয় লাগছে।
ওরা বলল, হ্যাঁ। কথা বাড়িয়ো না। মানে মানে কেটে পড়ো। এ দেশে লোকে হয় ভিক্ষে করবে, নয় কোটি টাকা লিটার পেট্রল আর ঊনকোটি টাকা কিলো চাল কিনবে।
তোমাদের গায়ে চাল গজাচ্ছে। এগুলো এক রকম অসুখ। আমি জানি এ অসুখ কী ভাবে সারাতে হয়, আমি চেঁচিয়ে বললাম।
হেহ, আমরা সারাতে চাই না।
আমি ঝক্কাস করে বার করলাম লুকনো ছুরি। লাফিয়ে পড়লাম এক জনের ওপরে। পিঠ থেকে চেঁছে নিলাম চাল। যত চাঁছি, তত গজায়, যত চাঁছি, তত। লোকগুলো চিৎকার করছে। চাল চাল চাল। চালের পাহাড়। দেখতে দেখতে সমস্ত চাল কালো পোকায় ঢেকে গেল। আমি ওকে ডাকতে লাগলাম, পেলি? চাল পেলি?
ও, ওই কালো ভিড়ের মধ্য থেকে বলল, চাল পেয়েছি, চাল পেয়েছি, তুই ঘরে গিয়ে চুলো জ্বালা। সব চালে তো কালো কালো কেরি পোকা। ধুস, ও ভিড়ের মধ্য থেকে মুখ তুলে বলে, ওগুলো পোকা নয়। মানুষের মাথা।
আমি সভয়ে বললাম, তুই ভিখিরি, না লুটেরা? ওরা লুটেরা, না ভিখিরি? তুই সঙ্গে ছুরি রাখিস?
রাখি না, আজ রেখেছিলাম। ওদের চেঁছে আরও চাল পেলি? পাচ্ছি আর চলে যাচ্ছে। ওগুলো লুঠ? না ভিক্ষা?
ও বলল, নিজের জিনিসও হাত পেতে নিলে ভিক্ষা, কেড়ে নিলে লুঠ। কোনওটাই দরকার হত না যদি ঘরে ঘরে সব্বাই অন্তত একটা কম্পিউটার কিনতে পেত।
ওর কথা বিশ্বাস করা উচিত? সব্বাই কম্পিউটারে মুন্ডু ঢুকিয়ে বসে আছে ভেবে আমার কেমন পাগল পাগল লাগছে।
এক জন ভূমিহীন কৃষকের কাছে, চালপট্টির নিরক্ষর শ্রমিকের কাছে, কাগজকুড়ানি মেয়েটার কাছে কম্পিউটার হয়তো পৌঁছবে শীঘ্র, কিন্তু রাউটার?
রাউটার?
Labels: Tilottama Majumdar


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home