আমার বিশ্বাস হচ্ছে নো। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। কিন্তু তা কি করে হবে? সবাই ভুল জেনেছে?
বাবা বলল, “সেরকমই তাে মনে হল। তাই তাে বলল যেন। আমি তাে জিজ্ঞেস করতে পারি না।”
মা বলল, “কাল রাতেও তাে ওই মেয়ের সঙ্গে কলি ছিল।”
বাবা বলল, “সেই কারণেই তাে চিন্তায় পড়েছি। কলি যদি সত্যি ওই মেয়ের সঙ্গে থেকে থাকে, কী হবে ভাবতে পারছ?”
বাকি কথা শুনতে পেলাম না। একটু পরে দু’জনে বেরিয়ে এল। এখন মায়ের মুখও বাবার মতাে থমথমে। রান্নাঘর থেকে দুধের গ্লাস এনে ঠক করে আমার সামনে বসিয়ে মা বলল, “তাের সঙ্গে কথা আছে কলি।”
আমি বললাম, “এখন বলবে?”
মা বলল, “দুধটা আগে খেয়ে নে। দোতলায় আয়।”
দোতলায় দেড়খানা ঘর। আগে একটাই ছিল, ভাই আর আমি থাকতাম। এক সময়ে ভাই বলল, “দিদির সঙ্গে থাকব না।”
মা চোখ পাকিয়ে বলল, “কেন থাকবি না?”
ভাই বলল, “বড় গার্জেনি ফলায়। আমি নিচে শােব।”
ভাই আরও বড় গার্জেনের পাল্লায় পড়ল। নিচে বাবার সঙ্গে ওর শােওয়ার ব্যবস্থা হল। তবে আমি তাে আর একা রাতে শুতে পারব না, মা ওপরে আমার কাছে চলে এল। সে ব্যবস্থারও দ্রুত বদল হল। বাবা কোনও কোনও রাতে পা টিপে ওপরে আসত। দরজায় টোকা দিত। সেদিন হয়তাে তখনও আমার ঘুম আসেনি। টের পেতাম, বাবা এসেছে। আমার যত না লজ্জা করত, বুঝতে পারতাম, আমি জেগে আছি জানলে মা বেশি লজ্জা পাবে। কেন জানি ভয়ও করত। তাই ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম। মা নিঃশব্দে খাট থেকে নেমে দরজা খুলে চাপা গলায় বাবাকে বকত।
“উফ! কী করছ? ছেলেমেয়ে রয়েছে, শুনতে পাবে।”
বাবা ফিসফিস করে বলত, “ছেলেমেয়ে ঘুমােচ্ছে। আর শুনতে পেলেই বা আমি কী করব? আমার ইচ্ছে করে না?”
মা দরজা টেনে বেরিয়ে যেত। মনে হয়, নিচের ডাইনিং রুমে যেত। ওখানে সােফা রয়েছে। ভাইয়ের ওপর আমার রাগ হত। তবে বেশিদিন রাগ করতে হল না, কিছু দিনের মধ্যে দোতলার ঘরের পাশে ভাইয়ের জন্য ছােট মাপের ঘর হল। বাবা-মা এক ঘরে ফিরে গেল।
দুধ পুরােটা খেতে পারলাম না, মাও কিছু বলল না। দোতলার ঘরে এলে দরজা দিয়ে মা কথা শুরু করল। যেন জিজ্ঞাসাবাদ।
“কাল তুই তিথির সঙ্গে ছিলি?” আমি বললাম, “ছিলাম তাে। কলেজ শেষ হলে কোচিং গেলাম, সেখান থেকে দু’জনে গেলাম মিতালিদির বাড়িতে। তুমি তাে সব জানাে মা। বলেই গিয়েছিলাম, ফিরতে রাত হবে। মিতালিদি-আশুদার ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির নেমন্তন্ন ছিল। এর মধ্যে ভুলে গেলে?”
মা দম বন্ধ করে, চোখের পাতা না-ফেলে বলল, “তারপর?”
আমি বললাম, “তারপর আর কী? রাত হয়েছে দেখে আশুদা আমাদের অটোতে তুলে। দিয়ে গেল। ভাইকে তাে ফোন করে গলির মােড়ে আসতে বললাম, ও বলল, পারব না, ওর নাকি পড়া আছে।”
মা গলা নামিয়ে বলল, “তিথির কী হল?”
আমি ভয় পাওয়া গলায় বললাম, “কী আবার হবে? আমি আমাদের গলির মােড়েই নেমে গেলাম, তিথি ওই অটোতেই চলে গেল। ওর তাে আরও খানিকটা যেতে হয়, তারপর রিকশার পথ। তুমি তাে জানাে। কেন কী হয়েছে মা?”
মা একটু চুপ করে থেকে বলল, “ওই মেয়ের সঙ্গে কাল রাতে তাের কথা হয়েছে? মেসেজটেসেজ কিছু?”
আমি বললাম, “না, কাল বাড়ি ফিরে দেখলাম, মােবাইলের ব্যাটারি গােলমাল করছে। ফোনটা বন্ধ করে রেখেছি। আজ দোকানে দেখাব। কী হয়েছে?”
মা আবার একটু চুপ করে থেকে কিছু ভাবল, বলল, “ফোন দেখাতে হবে না, তুই মােবাইলটা আমাকে দে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন?” মা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কেন তােমায় জানতে হবে না। তুমি দাও। কেউ যদি মােবাইলের কথা জানতে চায় বলবে, হারিয়ে গেছে।”
আমি আবার বললাম, “কী হয়েছে মা? বলছ না কেন? তিথির কিছু হয়েছে?”
মা রাগে গরগর করতে-করতে বলল, “কী হবে? ভদ্রলােকের মেয়ে রাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে যা হয়, তাই হয়েছে! ছি ছি!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ঘুরে বেড়ায়নি তাে!। বাড়ি ফিরছিলাম।”
মা এবার গলা তুলল। বলল, “ওই একই হল। অসভ্য, বাঁদর মেয়ে! কে বলেছিল নেমন্তন্নে যেতে? গেলেও সন্ধের আগে ফিরে এলে না কেন?”
আমাকে বাড়িতে বকুনি খেতে হয় না। ছােটবেলাতেও হয়নি। আমি শান্ত এবং বাধ্য। মেয়ে। লেখাপড়ায় মাঝারি ধরনের হলেও পড়তে বসা নিয়েও বাবা-মাকে কখনও বলতে হয়নি। বাড়িতে না-বলে, আমি কোথাও যাই না। বন্ধুদের বাড়ি বা সিনেমা দেখতে গেলে আগে পারমিশন নিই। শুধু তাই নয়, ফেসবুক-টেসবুকেও আমি খুব সাবধানে থাকি। অচেনা কেউ বন্ধুত্ব করতে চাইলে পারতপক্ষে যাই না। যদিও আমার সঙ্গে ছেলেরা বন্ধুত্ব করতে চায় না। চাইবার কারণও নেই। আমাকে দেখতে সুন্দর নয়। গায়ের রং কালাের দিকে, চেহারাও রােগা। সুন্দরী রােগা নয়, অসুস্থ ধরনের রােগা। বুকও অন্য মেয়েদের তুলনায় ছােট। তিথিরই তাে ব্রা-এর সাইজ কত বেশি। গড়নও সুন্দর। ও আমার বুক নিয়ে চিন্তিত।
“কলি, ম্যাসাজ করা।” আমি লজ্জা পেয়ে বলি, “ধুস! কী হবে?” তিথি বলে, “তাের কিছু হবে না, তাের বরের অসুবিধে হবে। আদর শুরুতেই ফুরিয়ে যাবে।”
আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। চারপাশ তাকিয়ে বলি, “চুপ কর।”
তিথি নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আর-একটা পথ আছে। একজন বয়ফ্রেন্ড যদি ফিট করতে পারিস। নটি বয়ফ্রেন্ড। ফাঁক পেলেই হালুম হুলুম করে। থাবা বসাবে।”
আমি তিথির পিঠে কিল মারি। তিথি যেমন মজার, তেমন ডাকাবুকো। ওকে দেখতেও ঝকমকে। সাজতেগুজতে ভালবাসে। আমার মতাে নয়। আমি বেশি সাজটাজের মধ্যে নেই।
রােগাভােগা, কালেকুলাে মেয়ে। বেশি সাজলে ভূতের মতাে লাগে। তিথি একদিন আমাকে তার ব্যাগ থেকে কন্ডােমের প্যাকেট বের করে দেখিয়েছিল। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
“একটা রাখবি নাকি?”
আমি নিচু গলায় বলি, “তিথি, তাের পায়ে পড়ি, ওটা আগে ব্যাগে ঢােকা।”
আমি মাকে মােবাইল ফোনটা দিতে মা ঘটনা বলল। আমি বিস্ফারিত চোখে সব শুনলাম। শুনতে-শুনতে বিছানার চাদর খিমচে ধরলাম।
মা বলল, “বসাকদের বাগানে একপাশে পড়ে ছিল। মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে একজনের নজরে আসে। চেনা যাচ্ছে না। পাশে একটা রড ছিল। লােহার রড। মনে হয় ওটা দিয়ে...”
আমি কোনওরকমে বললাম, “বেঁচে আছে?” মা বলল, “জানি না। জানতে চাইও না। আমি শুধু আমার মেয়েকে নিয়ে ভাবছি। কে মরল, কে বাঁচল দেখার দরকার নেই। কাল তােদের সঙ্গে আর কেউ ছিল? ওই মেয়ের সঙ্গে? কোনও ছেলে?”
আমার গলা থেকে কথা বের হচ্ছে না। কোনওরকমে অস্ফুটে বললাম, “না।”
মা একটু চুপ করে থেকে হিসহিসিয়ে বলল, “ঠিক আছে। ঘর থেকে বেরােবি না। মােবাইল ফোন আমি বন্ধ করে আমার কাছে রেখে দিচ্ছি। তাের বাবা বলেছে।”
আমি খাটের ওপর ধপ করে বসে পড়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলাম, “মা, কী হবে?”
মা এগিয়ে এসে দু'হাত দিয়ে মুখটা চেপে। ধরে বলল, “চুপ, একদম চুপ। এক ফোঁটা কাঁদবি তাে মেরে পিঠ ভেঙে দেব! রাস্তায় ধিঙ্গিপনার সময় মনে ছিল না? মনে ছিল না মেয়ে হয়ে জন্মেছিস? এখনকার দিনকাল কেমন জানিস? অসভ্য! কেন? কেন রাত করেছিলি? কেউ যদি জানতে পারে কী হবে ভাবতে পারছিস? মুখ থেকে টু শব্দটি বের করবি না। আশপাশের বাড়িতে যেন ঘুণাক্ষরে বুঝতে না পারে। এমন কোনও আচরণ করবি না যাতে মনে হয়, ওই মেয়ের সঙ্গে তাের ঘনিষ্ঠতা ছিল। মনে থাকবে?”
শুধু বাবার কাছ থেকে নয়, মা খবর পেয়েছে। কমলদির কাছ থেকেও। কমলদি সকালে বাসন। মাজতে আসে। একটু বেলা হয়। আরও দুটো বাড়ি হয়ে আসে। কমলদি এসে মাকে বলল, “জানাে বৌদি, কাপড়চোপড় খােলা অবস্থায় ঝােপের ধারে পড়েছিল। প্রথমটায় চেনা যায়নি। মুখ ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। পরে ব্যাগে কাগজ পেয়েছে। কী যেন নাম বলছে সবাই...”
মা কমলদিকে থামিয়ে দিয়েছে, “থাক ওসব কথা, আমাদের নাম জেনে দরকার কী? তুমি কাজ সারাে দেখি কমলা”
কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গলা ছেড়ে কাঁদি। গলা ছেড়ে তাে দূরের কথা, বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদতেও পারছি না। আমার ভয় করছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। বিছানার চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে খাটের গায়ে হেলান দিয়ে জবুথবু মেরে বসে রয়েছি। একটু কি কাঁপছি? হ্যাঁ, কাঁপছি। কাঁপছি অথচ কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ভয় চরম হলে ঠান্ডা গরমের অনুভূতি গােলমাল করে।
বাবা যেমন বাজার করতে গিয়ে জেনেছে, ভাই খবর পেয়েছে বন্ধুদের কাছ থেকে। ওর হােয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ এসেছে। আসবেই তাে। এলাকাটা তাে বড় কিছু নয়। সবাই সবাইকে চেনে। ভাই বাবার কাছে এল। আমি ওই সময় নিচে গিয়েছিলাম। মা যদি মােবাইলটা ফেরত দেয়, একজন-দু’জনকে ফোন করে ঘটনাটা পরিষ্কার করে জানতে পারি। তার আগেই ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, “বাবা, তুমি শুনেছ?”
বাবা থম মেরে বসেছিল। ক্লাস টেনে পরা ছেলের দিকে মুখ তুলে বলল, “কী হয়েছে?”
ভাই বড় বড় শ্বাস ফেলে বলল, “বসাকদের বাগানে আজ নাকি...”
বাবা ভাইকে থামিয়ে দিয়ে চাপা ধমক দিয়ে বলল, “বিন্টু, তােমার লেখাপড়া হয়ে গেছে? কোন বাগানে কী হয়েছে এই সব আলােচনা করার সময় এখন? যাও, পড়তে যাও।”
ভাই বলল, “বাবা, শুনছি মেয়েটা নাকি দিদির কলেজে পড়ত। সত্যি? দিদিকে জিজ্ঞেস করি, চিনত কিনা।”
বাবা ঠান্ডা গলায় বলল, “না জিজ্ঞেস করবে । এটা জিজ্ঞেস করার মতাে কোনও বিষয় নয়। তােমার দিদির কলেজে এক হাজার মেয়ে পড়ে, সে তাদের সবাইকে চেনে?”
ভাই বলল, “হতেও তাে পারে বাবা।” বাবা চিৎকার করে বলে উঠল, “শাট আপ! একটা নােংরা মেয়েকে তােমার দিদি চিনবে কেন? তুমি এ বিষয়ে আর একটা কথাও বলবে না। পড়তে যাও!”
ভাই ড্রইংরুমে গিয়ে টিভি চালাল। খবরে নিশ্চয়ই বলবে। লােকাল চ্যানেলে এসব বলে। টিভির আওয়াজে বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে হুংকার দিলেন, “টিভি কে চালিয়েছে?”
ভাই বলল, “আমি।” বাবা কথা না-বাড়িয়ে ভাইয়ের গালে ঠাসিয়ে চড় মারল। মা ছুটে আসে, আমিও গেলাম। বাবা রাগে কাঁপছে, বড় বড় শ্বাস ফেলে বলে, “খবরদার, এই বাড়িতে যেন টিভি না-চলে। খুন করে ফেলব।”
মা আঁচলে রান্নার হাত মুছতে মুছতে বলল, “ছেলেকে মারছ কেন? তুমিই তাে দিনে দশবার করে খবর দেখাে। গাঁক গাঁক করে চলে। এখন না-চললে তাে আশপাশের বাড়ির সবাই সন্দেহ করবে।”
বাবা মুখ নামিয়ে বলল, “সন্দেহের বাকি কী আছে? বিন্টুর বন্ধুরাও যখন জেনেছে, ওই মেয়ে কলির বন্ধু হতে পারে, বাকিরাও জানবে। জানবে কী, এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনেও গিয়েছে।”
মা ভয় পাওয়া গলায় বলল, “কী হবে তা হলে?”
আমি মায়ের কাঁধ চেপে ধরলাম। মা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝিয়ে বলল, “তুই এখানে কী করছিস? যা, ওপরে যা। বাইরের কেউ এলে দেখতে পাবে। নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে বসে থাক। বুঝতে পারছিস কত বড় বিপদে আমাদের ফেলেছিস? পারছিস বুঝতে?”।
আমি ফুঁপিয়ে উঠে বললাম, “আমি কী করেছি? তিথি আমার বন্ধু।”
মা ফোঁস করে উঠল, “এমন মেয়ে বন্ধু হয় কী করে? যে-মেয়ে অত রাতে ওখানে যায়। সেই মেয়ে তাের বন্ধু! বলতে লজ্জা করছে না? অন্ধকার গাছগাছালির মধ্যে ওর বাড়ি? অত রাতে কী করছিল? কোনও ভদ্রলােকের মেয়ে যায়? মর্নিং ওয়াক, শীতের দুপুরে পিকনিক, বিকেলে বেড়ানাে ছাড়া কেউ যায় না। বল, যায়?”
আমি বললাম, “তােমরা তাে ওকে চিনতে। বাড়িতেও তাে কতবার এসেছে। ও ভাল।”
মা বলল, “চুপ কর। বাড়িতে এসেছে একথা আর মুখেও আনবি না।”
আমি বললাম, “হতে পারে হয়তাে শর্টকাট করবার জন্য বাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। হতে পারে না?”
মা বলল, “না, হতে পারে না। কোনও ভদ্রসভ্য মেয়ে রাতের বেলায় একাজ করবে না।”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “হয়তাে ওকে জোর করে নিয়ে গেছে।”
বাবা কঠিন গলায় বলল, “তােমার বন্ধুটি খুকি নয় যে, বড় রাস্তার অটো স্ট্যান্ড থেকে তাকে জোর করে অত দূরে নিয়ে যাবে। ওখানে। লােকজন থাকে। স্পষ্ট বােঝা যাচ্ছে, নিজের ইচ্ছেতে গেছে। আর সেই ইচ্ছের কথা তুমিও হয়তাে জানতে। কারণ তার কিছুক্ষণ আগেও তুমি ওর সঙ্গে ছিলে।”
আমি বললাম, “বাবা, এসব কী বলছ!” বাবা দম নিয়ে বলল, “এখন আমি বলছি, একটু পর থেকে সবাই বলবে। টিভিতে বলবে, খবরের কাগজে বলবে।”
মা মুখে হাত চাপা দিয়ে খানিকটা সময় বসে থাকল। তারপর মুখে তুলে বলল, “আমাদের মেয়ে হয়ে তুই এমন করবি আমি কল্পনাও করতে পারছি না।”
বাবা উত্তেজিত গলায় বলল, “কী করে কল্পনা করবে? ছেলেমেয়ের দিকে কোনও নজর রয়েছে তােমার? কার সঙ্গে ওরা মেলামেশা করছে খবর রাখাে? সারাদিন তাে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।”
মা বলল, “নিজেকে নয়, তােমাদের সংসারের হাল ঠেলতে ব্যস্ত। আর ছেলেমেয়ে তাে আমার একার নয়, তুমি কেন নজর রাখাে না?”
বাবা আরও উত্তেজিত হয়ে বলল, “কী নজর রাখব? মেয়ের পিছু নেব? কার সঙ্গে মেলামেশা করছে তার বায়ােডাটা জোগাড় করব? তার চরিত্র কেমন খোঁজ করব? রাতবিরেতে ঝােপ জঙ্গলে যায় কিনা তার হিসেব রাখব?” বাবা পায়চারি শুরু করল। বলল, “এবার পুলিশ আসবে।”
আমি বললাম, “পুলিশ আসবে কেন?” বাবা বলল, “যখন জানবে ওই বদ মেয়ের সঙ্গে তুমি রাত পর্যন্ত ছিলে, তখন তােমাকে জিজ্ঞেস করতে আসবে, কোথায় ছিলে, কেন ছিলে, কতক্ষণ ছিলে।”
আমি বললাম, “বলব, সব বলব।”
মা লাফ দিয়ে উঠে বলল, “থাবড়ে তােমার দাঁত ফেলে দেব! কাউকে কিছু বলবে না। ওপরে যাও, আমি না-বললে দরজাও খুলবে না। খাবার ওপরে দিয়ে আসব।” মুখ ফিরিয়ে মা ভাইকে। ডাকল, “বিল্ট, অ্যাই বিন্দু।” ভাই ভিতরের ঘর। থেকে এসে দাঁড়াল। মা বলল, “কেউ যদি দিদির খোঁজ করে, বলবি জ্বর হয়েছে, ওষুধ খেয়ে ঘুমােচ্ছে।”
বাবা বলল, “ওকে কিছু বলতে হবে না, কেউ এলে আমি দরজা খুলব। আসবে তাে পুলিশ।”
ভাই কাঁচুমাচু গলায় বলল, “আজ বিকেলে আমার পড়তে যাওয়া আছে।”
মা বলল, “যাবে না, বাড়ির বাইরে পা দেবে।”
আমি ওপরের ঘরে চলে এলাম। দুপুরে মা থালায় ভাত দিয়ে গেল। খেতে পারলাম না। ভাত নাড়াচাড়া করে থালা বাইরে রেখে এলাম। খাটে চাদর মুড়ি দিয়ে কুঁকড়েমুড়ে শুয়ে পড়লাম।। তিথি কেন কাল রাতে বসাকদের বাগানে গেল? সঙ্গে কি ওর কোনও বয়ফ্রেন্ড ছিল? হয়তাে মােবাইলে বলে রেখেছিল, ‘অপেক্ষা করাে, আমি আসছি।’ নাও হতে পারে। শর্টকাট করতে অটো থেকে নেমে ওই পথ ধরেছিল হয়তাে।
কেউ জোর করে ধরে নিয়ে যায়নি তাে? অনেকে। মিলে? ওকে কতরকম ভাবে অত্যাচার করছে? ইট দিয়ে, রড দিয়ে... আমি ভাবতে চাই না। কেন চাই না? কারণ আমি একজন ভিতু মেয়ে। নিজের ভয় আর বাড়ির দোষারােপ শুনে এলােমেলাে হয়ে গিয়েছি। বিধ্বস্ত লাগছে। বাবা মা ভাইয়ের। কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি— ওদের বিপদে ফেলেছি। কেন কাল আমি নেমন্তন্নে গিয়েছিলাম?
কেন তিথি সঙ্গে ছিল? কেন? তিথি আমার বন্ধু কেন হল? সে তাে আমার মতাে নয়, আমিও তাে তার মতাে নই। সে সাহসী, ডাকাবুকো, ব্যাগে কন্ডােম রাখতে পারে। আমি ভিতু। সে সুন্দর, আমি বিচ্ছিরি। তারপরেও তার সঙ্গে কেন মিশতে গেলাম? কলেজে, পাড়ায়, কোচিং ক্লাসে কত মেয়ে রয়েছে, তারা কেউ কেউ আমারই মতাে। সাধারণ, রােগভােগা। বন্ধু হিসেবে। তাদের কাউকে বেছে নিতে পারতাম। নাকি এটাই আমার নিয়তি ছিল? ডেস্টিনি। অথবা কে জানে, ভিতু মেয়ের আবরণ ফেলে তিথির মতাে হতে চেয়েছিলাম হয়তাে। তাই ওকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।
এলােমেলাে ভাবতে-ভাবতে এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঠিক ঘুম নয়, ঘােরের মতাে হয়তাে। সেই ঘাের ভাঙল দরজা ধাক্কার। আওয়াজে। তুমুল ধাক্কা। ভাই চিৎকার করছে—
“দিদি দরজা খােল, দরজা খােল। নিচে গিয়ে দেখ কে এসেছে। অ্যাই দিদি, মা ডাকছে তােকে। আর চিন্তা নেই দিদি, তিথিদি এসেছে। খবর ভুল ছিল, ওই মেয়ে তিথিদি নয়, অন্য একজন। দিদি, বাবা তােকে ডাকছে।”
আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আমি কি এখনও ঘােরের মধ্যে রয়েছি? ভাই কি ঘােরের মধ্যেই আমাকে ডাকছে?
আমি নিচে নেমে এলাম। হ্যাঁ, তিথিই এসেছে। ওই তাে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে গল্প। করছে। বাবা-মা খুব হাসছে। এ কি সত্যি? নাকি এখনও ঘােরের মধ্যে রয়েছি?
এখন রাত কটা? বেশি নয়, সেদিনকার মতােই হবে। আমি আর তিথি বসাকদের বাগানের পাশ দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছি। গাছগাছালির আলাে। ছায়ায় অন্ধকার পথ। তিথির সঙ্গে মেশা নিয়ে বাড়িতে আর কোনও আপত্তি নেই। কোনও কোনওদিন বলি, তিথির বাড়িতে যাচ্ছি, দু’জনে মিলে একসঙ্গে পড়ব। ফিরতে রাত হবে। পড়া হয়ে গেলে আমরা বসাক বাগানের কাছে চলে আসি৷ তিথি আমাকে নিতে চায় না। আমি জোর করে আসি। জানি, ভয়ঙ্কর বিপদে জড়িয়ে পড়তে চলেছি। তাও তিথি আমাকে নিয়তির মতাে টানে।
আজও এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে অপেক্ষা করছি আমরা। সেই অচেনা মেয়েটা সেদিন যা পারেনি, আমরা পারব। তিথি বাড়ি থেকে বেরােবার সময় আমাকে একটা বেঁটে লােহার রড দেয়। খুব শক্ত। ঠিক মতাে মারতে পারলে একটা ঘা-ই যথেষ্ট হবে। আমি বই খাতার ব্যাগে রেখে দিই আর বাইরে থেকে চেপে ধরে হাঁটি। কেমন ঘােরের মতাে লাগে।